আপনার পছন্দের বই কিনুন!
লেখক : ইকবাল হোসেন
বিষয় : সাইন্সফিকশন, সিরিজগল্প
ধরন: ওয়েববুক, অর্থাৎ আপনি অনলাইনে ফ্রি পরতে পরবেন।

জিনম

সকালে মেইল এসেছে আগামীকাল সকাল ৯ টায় RCB তে যোগ দেয়ার জন্য।  RCB উচ্চমাত্রার একটি রিসার্চ সেন্টার। গত ১০ বছরে কম করে হলেও সাতশত বিভিন্ন বয়সের এবং পেশার মানুষকে সেখানে ডেকে নেয়া হয়েছে কাজ করার জন্য। এতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারাকে যদিও সবাই অতি আনন্দের সাথে গ্রহন করা উচিত কিন্তু তা নয়। যারা যাচ্ছে তাদেরকে তার পরিবার অতি বিষাদ এবং দুঃখভরা মনে বিদায় দিচ্ছে।


কারণ, যারা যাচ্ছে তারা আর ফিরে আসছে না। এমনকি যাবার পর তাদের সাথে আর কোন যোগাযোগ থাকছে না। তাদের প্রত্যেকের পরিবার পরিজন অধির আগ্রহে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে ন্যুনতম একটি খোজ পাওয়ার জন্য। কিন্তু কোন প্রকার খোজ পাওয়া যায় না। 


RCB (Research Center of Bangladesh) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের শেষের দিকে। এটি এমনি একটি টপ সিক্রেট প্রজেক্ট যে এর অবস্থান কোথায় তা হাতে গুনা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ জানেনা। এটি প্রতিষ্ঠিত হবার কারণটা শুরু হয়েছিল আরো দুই বছর আগে।


২০১৯ সাল

শতাব্দীর শক্তিশালী CAVID-19 ভাইরাস আক্রমন করে মানব জাতির উপর। কিছু বুঝে উঠার আগেই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে মারা যায় লক্ষাধিক মানুষ। বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এর কোন। প্রতিকার বের করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। প্রতিদিন লাশের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে। যেহেতু CAVID-19 একটি ছোঁয়াচে ভাইরাস সেহেতু মুহুর্তেই ছড়িয়ে পরতে লাগলো সমগ্র মানব জাতির উপর। 

কোন এক বিস্ময়কর কারণে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে যেগুলো জ্ঞান, সমৃদ্ধি, প্রাচুর্য, অর্থ, সম্পদ এবং সর্বোপরি প্রযুক্তিতে উন্নত সেখানে মানুষগুলো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে লাগলো গণহারে এবং বুঝতে না বুঝতেই হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ মানুষ মারা গেলো। অন্যান্য দেশগুলো যেগুলো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত তারা যে একেবারে নিরাপদ রইল তা নয়। তাদের মধ্যেও আক্রান্ত হতে লাগলো এবং মারাও যেতে থাকলো, কিন্তু তুলনামুলকভাবে খুবই কম।

আমেরিকা, ইটালী, স্পেন, চীন, জাপান ও কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও শক্তি ব্যায় করে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরীতে রাত দিন কাজ করতে লাগলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হলো। দেখা গেলো তাদের তৈরী প্রতিষেধক ব্যবহার করে ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে।

সমগ্র পৃথিবীতে হৈচৈ পরে গেলো। প্রতিষেধক উৎপাদনে সকল উন্নত দেশগুলো বিলিয়ন ডলার ব্যায় করার জন্য এগিয়ে এলো। সমগ্র মানবজাতি বিশাল এক অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার আনন্দে নিশ্চিন্ত হবার প্রয়াস পেলো।

পরক্ষনেই ভয়াবহ একটি খবর পুরো পৃথিবীকে দ্বিতীয়বারের মতো স্তব্ধ করে দিলো। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান কাউন্সিল থেকে জানানো হলো যে-

করোনা ভাইরাসে রয়েছে একসুত্রক আরএনএ জিনোম। এটি পুর্বের সকল ভাইরাসের তুলনায় অনেকটাই বড় এবং শক্তিশালী। ভয়ঙ্কর ব্যপারটি হলো এটি তার নিজস্ব জিনোম কোড নিজে নিজে পরিবর্তণ করে আবার  পুণর্গঠণ করে নিতে সক্ষম। যে কারনে প্রতিষেধকগুলো সাময়িক ভাবে কাজ করলেও পরবর্তীতে করোনা ভাইরাস তার জিনোমের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তণ করে নেয়ার কারনে প্রতিষেধকগুলো আর কোন কাজেই লাগে না।

আবারো নিরাশায় ডুবে গেলো সমগ্র পৃথিবীর মানুষ।

এরি মধ্যে দেখা দিলো আরেক বিপর্যয়। যারা দীর্ঘদিন যাবত বিজ্ঞানাগারে থেকে থেকে করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা সহ বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছিলো তাদের অনেকের মধ্যেই মানষিক কিছু উপসর্গ দেখা দিতে লাগলো। যেমন- কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ তাদের নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে লাগলো, অবশ্য অল্প সময়ের জন্য। কেউ কেউ মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলো। কেউ আবার স্মৃতির অনেক কিছুই ভুলে যেতে লাগলো। 

এক সময় এমন হলো যে, একজন বিজ্ঞানী বা ডাক্তার দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করানো অসম্ভব হয়ে পরলো। এতে করে ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরীর প্রক্রিয়া অনেকটাই ধীর হয়ে এলো।

এদিকে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই দ্রুত বাড়তে লাগলো। ৭৭৭ কোটি জনসংখ্যায় ভরপুর পৃথিবীটাকে হঠাৎই মনে হলো শুণ্যের দিকে ছুটে চলা একটি গতিশীল বস্তু। 


২০২৩ সাল

পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন প্রায় অর্ধেকে কমে এসেছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ বড় বড় শহরগুলো পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরিতে। কোথাও কোন প্রাণের স্পন্দন নেই যেনো। যদিওবা কিছু কিছু স্থানে মানুষ টিকে আছে সর্বোচ্চ ইনটেনসিভ কেয়ারে। মাটির নিচে বিশেষ ব্যবস্থাপণায় কোন রকমে নিজেদেরকে বাচিয়ে রাখার চেষ্টা। 

এখনো পর্যন্ত কোন কার্যকরী প্রতিষেধক তৈরী করা সম্ভব হয়নি। যেটাই তৈরী করা হয়েছে দেখা গেছে পরক্ষণেই সেটা আর কাজ করছে না। 

এরমধ্যে দুর্বল দেশগুলো যারা কিনা এতো দিন অনেকটাই নিশ্চিন্ত ছিলো কারণ তাদের দেশের আক্রমনের প্রভাব ছিল খুবই কম। যদিওবা ২% এর মতো মানুষ আক্রান্ত হচ্ছিল কিন্তু এর মধ্যে ১% এর চাইতে বেশি মানুষ সুস্থ্যও হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু  বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন দেখলো দুর্বল দেশগুলোতে সংক্রমনের মাত্রা একেবারেই কম তখন তারা অতি গোপনে বিভিন্ন ভাবে সেইসব দুর্বল দেশগুলোতে চলে যেতে লাগলো এবং সেখানে বসতি স্থাপন করতে শুরু করলো। ফলে  যা হবার তাই হলো।


২০২৭ সাল

পৃথিবীতে এখন সর্বমোট জীবিত মানুষের সংখ্যা ২'শ কোটিরও নিচে নেমে এসেছে। এখন আর শুধু উন্নত দেশ নয় সারা পৃথিবীতে এখন একই হারে মানুষ মারা যাচ্ছে। যদিও এখন মারা যাবার গতি কম। কারণ এখন মানুষইতো কম। কিন্তু যারা বেঁচে আছে তারা কি   অস্বাভাবিক ভাবে বেঁচে আছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে তাদেরও সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু মানুষ এখন স্বাভাবিক জীবন থেকে দুরে চলে এসেছে। বেশিরভাগ মানুষই মাটির নিচে কিংবা বিশেষ ভাবে তৈরী দুর্গে অবস্থান করছে।


বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটি থেকে নেমে এসেছে মাত্র ২ কোটির কিছু উপরে। চারিদিকের বাতাস দুষিত হয়ে আছে। যদিও গত কয়েক বছর আগে বিশেষ একটি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মৃত মানুষদের সৎকারের সহজ ব্যবস্থা তৈরী করা হয়েছে। এটি সর্বপ্রথম তৈরী করেছে জাপান। এ যন্ত্রে মৃত মানুষকে রেখে সুইচ অন করে দিলে ২ মিনিটের মধ্যে মানুষটির সকল জীবিত কোষ (আরএনএ ও ডিএনও সহ) একেবারে জড় বস্তুতে পরিনত করে ফেলে। এর শক্তিশালী রেডিয়েশন সরাসরি জিনোমের ভেতরের নিউক্লিওটাইডের অনুক্রমকগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে দেয়। এ আবিষ্কার অন্যান্য দেশে ব্যবহার করে কিছুটা হলেও পরিবেশ দুষণ কমিয়ে এনেছে।

প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব চেষ্টায় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও গবেষণা চালানোর জন্য স্থাপন করেছে RCB। দেশের সকল জিনিয়াসদের নিয়ে আসা হচ্ছে এখানে কাজ করার জন্য। দুষণমুক্ত এবং নিরাপদ রাখার জন্য এটির সর্বোচ্চ গোপণীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। 

এরই মধ্যে ডাক্তার এবং বিজ্ঞানীদের সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন যাবত যারা এই ভাইরাসটি নিয়ে কাজ করে তারা কোন না কোন ভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। শত চেষ্ট করেও এটিকে রোধ করা যাচ্ছে না। যদিও এরি মধ্যে আবিস্কৃত হয়েছে করোনা ভাইরাস ডিটাকটর। বিভিন্ন যন্ত্র এবং বিশেষ এক ধরনের চশমা। এটি চোখে পড়ে ভাইরাসের অস্থিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। যে কারনে এখন গবেষণা কিছুটা সহজ হয়েছে। এবং সতর্ক থাকাটাও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

---


২০৩০ সাল (চলমান)

আমি যে খুব বেশি সাহসী তা না। কিন্তু RCB থেকে ডাক আসার পর আমার মধ্যে কোন প্রকার ভয় ফিল করছিনা। মনে হচ্ছে, আমি বোধ হয় এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। আসলেই আমি প্রস্তুত ছিলাম, আমার অবচেতন মন এটা জানতো। তাই আমার কাছে ব্যপারটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে গত মাসে যখন সামান্থা চলে গেলো, তখন খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম। 

সামান্থা আমাদের দুই ব্লক ডানের মাইনাস ৭ তলায় থাকতো। জিনিয়াস ছাত্রী। যদিও গত ১০ বছর ধরে পৃথিবীতে আগেকার মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। যা আছে সবই ভার্চুয়াল বাসায় বসে অনলাইনে ক্লাস করো, পরীক্ষা দাও। সেখানে কি করে যেনো সব সময়ই সামান্থা সর্বোচ্চ মার্ক পেয়ে ফেলতো। রেজাল্ট দেয়ার পর আমি যখন অনলাইনে আমার রোল খুজে বেড়াচ্ছি নিচের সিরিয়ালে তখন দেখতাম একেবারে প্রথম লাইনটাতে সামান্থার নামটা সগৌরবে বসে আছে। তাই তার প্রতি সম্ভোবত ঈর্ষা ছিলো আমার, কোন আগ্রহ নয়। গ্রুপে ক্লাস করতে হতো বলে তার সাথে পরিচয়ও ছিলো। 

হঠাৎই সকালে সামান্থা ফোন দিলো আমাকে। সচরাচর আমরা গ্রুপ কলে কথা বলি। সামান্থার সাথে আমার কখনো এভাবে ফোনে কথা হয়নি।

  • আমার ডাক এসেছে RCB থেকে। _সামান্থা

  • কি বলো, কেনো? _আমি

  • অন্য সবাইকে যেজন্য ডাকে। _সামান্থা

  • তোমাকে ডাকার কারন তুমি হলে সুপার ব্রিলিয়ান্ট। _আমি

  • এবার হলোতো, তোমার আমার উপর যত রাগ ছিলো এবার হয়তো কিছুটা কমবে। _সামান্থা

  • কি বলো? তোমার উপর আমার রাগ থাকবে কেনো? _আমি

  • আমি বুঝি, তোমাদের ছেলেদের সব কিছুই আমরা বুঝি। _সামান্থা

  • না সামান্থা, তোমার উপর আমার কোন রাগ নেই। তুমি অনেক ভালো স্টুডেন্ট তাই বলে হয়তো কিছুটা ঈর্ষা কাজ করে, কিন্তু রাগ করতে যাবো কেনো?

  • আরিয়ান, তোমার সাথে একটা কথা শেয়ার করতে চাই। করবো? _সামান্থা

  • হুম, বলো।

  • ওরা আমাদেরকে ডেকে নিয়ে যায় RCB তে। আমরা সবাই জানি ওখানে ভাইরাসের উপর রিসার্চ হয়। পৃথিবীকে ভাইরাস মুক্ত করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা ওরা করছে। আমি দেখেছি প্রথম ৩ বছর বেছে বেছে বয়স্ক এবং বিশেষজ্ঞদেরকে ডেকে নিতো। এরপর ৩ বছর ওরা অপেক্ষাকৃত মধ্যবয়স্ক এবং ব্রিলিয়ান্টদেরকে নিচ্ছে। কিন্তু এরপর থেকে তারা বেছে বেছে শুধু ব্রিলিয়ান্ট বাছাই করছে না। ওদের এখনকার সিলেকশনের মধ্যে কম বয়স্কই থাকছে সবাই। _সামান্থা

  • কি বলো? এই যে তোমাকে বাছাই করলো? তুমিতো ব্রিলিয়ান্ট। _আমি

  • তুমি যদি একটু খেয়াল করো তবে দেখবে গত ক’মাসে আমাদের এলাকা থেকে সাফি, রিতু, ওমর, রাতুল, রিহাম ও প্রীতমকে ডেকে নিলো। তুমি জানো ওরা সবাই আমাদের সম বয়সি। 

  • হুম, তুমি ঠিক বলেছ। _আমি

  • আমার সাইবার ক্রেক নামে একটি গোপন টিমের সাথে পরিচয় আছে। ওদের মাধ্যমে আমি কিছু খবর পাই। করোনাভাইরাস এর জিনোম অনলাইন প্রোফাইল যেটি ইতোমধ্যে সবার জন্য উম্মুক্ত করে দিয়েছে, এর মাধ্যমে বিশ্বের সবাই এ ভাইরাসের আপডেট বৈশিষ্ট্য গুলো সম্পর্কে জানতে পারে এবং এর প্রতিষেধক তৈরীতে কাজ করতে পারে। সাইবারক্রেক বর্তমানে সে জিনোম নিয়ে কাজ করছে।

  • তাই নাকি? করোনাভাইরাস নিয়ে সাইবারক্রেক এর কাছে আপডেট তথ্য কি আছে? _আমি

  • হ্যা। ওরা জানিয়েছে গত দশ বছরে করোনাভাইরাসের উপর প্রচুর গবেষনা করেছে পৃথিবীর তাবত বিজ্ঞানী সহ অসংখ্য মানুষ। এর জিনোমের AI গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস তৈরী করা হয়েছে। একে বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষন করে এ যাবত অসংখ্যবার এর প্রতিষেধক তৈরী করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চার্যজনক ভাবে প্রতিষেধক প্রয়োগের কিছুদিনের মধ্যেই করোনা তার জিনোমের মধ্যে পরিবর্তন করে নেয়। যার ফলে   প্রতিষেধকটি আর কাজ করেনা।  _সামান্থা

  • কি বলো? এতো সাংঘাতিক শক্তিশালী আর চালাক ভাইরাস। _আমি

  • হ্যা, তাই। গত এক দশকে ভাইরাসটি তার মধ্যে অনেক প্রতিষেধক হজম করে নিজেকে শক্তিশালী করে তুলেছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো বিজ্ঞানীরা এখন আশা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছে এ ভাইরাস থেকে পরিত্রানের। আশা এখন নিরাশার পর্যায়ে নেমে  এসেছে।

এপর্যায়ে সামান্থা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আমি ভেবে অস্থির হয়ে যাই। গত দশটি বছর মানুষ মনের মধ্যে একটি আশা নিয়ে প্রকৃতির সাথে সর্বোচ্চ যুদ্ধ করে নিজেদেরকে টিকিয়ে রেখেছে এই ভেবে যে, একদিন এই ভয়ংকর ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরী হবে এবং এ থেকে মানুষ অযাচিত মৃত্যু থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু সামান্থার কথা শোনার পর আমার পায়ের নিচের মাটিটা মনে হলো কিছুটা নড়ে উঠল।  

  • আমাকে আগামীকাল চলে যেতে হবে। আমি যতটুকু খবর পেয়েছি মনে হচ্ছে বিজ্ঞানিদের উপর পর্যায়ে কোন একটি বড় পরিকল্পনা আছে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেছে বেছে কম বয়সী বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ বাছাই করে নিচ্ছে। কিন্তু তাদের পরিকল্পনার ব্যপারটা আমার কাছে অস্পষ্ট। তুমি জানো এখন পর্যন্ত চলে যাওয়া কেউই আর ফেরত আসেনি। অতএব, আমার যাওয়াটাও একেবারেই চলে যাওয়া। মোটামুটি সবার কাছ থেকেই বিদায় নিয়ে নিয়েছি। সবশেষে তোমাকে ফোন করলাম। তুমি ভালো থেকো। আমার জন্য দেওয়া করো। অন্তত আমার মৃত্যুটা যেনো ভালো মৃত্যু হয়। _সামান্থা

এপর্যায়ে আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা কি বলবো। মনটাকে খুব দুর্বল মনে হচ্ছিলো। সান্তনা দেবার কথাও মাথায় আসলো, কিন্তু মেকি সান্তনা দিতে আমার ভালো লাগে না।

  • সামান্থা, যদিও তোমাকে আমি ঈর্ষা করতাম কিন্তু সত্যি জেনো আমি তোমার ধরনটাকে খুব পছন্দ করতাম। তুমি সব সময়ই সেরা কাজটিই করতে। সম্ভোবত ভালোটাই করতে তুমি। তোমার মধ্যে অন্যরকম একটা ব্যাপার আছে। তোমার চিন্তাগুলোর সাথে আমি মনে মনে একাত্ব হতাম। দোওয়া করি আল্লাহ তোমাকে ভালো একটা ভবিষ্যত দান করুন। _আমি

  • খোদা হাফেজ বন্ধু। ভালো থেকো।


তিন দিন পর

একটি মেইল এসেছে সামান্থার কাছ থেকে। গত দুই দিন আগেই সামান্থা চলে গেছে। অতএব মেইলটা সামান্থা যাবার আগেই পাঠিয়ে গিয়েছে তিন দিনের টাইমার সেট করে। আজ তিনদিন পর মেইলটা আমার কাছে এসেছে। 

প্রিয় আরিয়ান,

কি, আশ্চর্য হচ্ছো ‘প্রিয়’ শব্দটার দিকে তাকিয়ে? কিছু আশ্চর্যকর বিষয় তোমাকে এখন আমি জানাবো । হিসেব মতে আমার চলে আসার তিন দিন অতিবাহিত হলো আজ। আমি যেখানে যাচ্ছি সেখান থেকে তোমার সাথে কোন যোগাযোগ করা যাবেনা আমি জানি, কিন্তু আমি খুব খুশি হবো যদি কোনভাবে তোমার সাথে যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা করা যায়। যাই হোক, তোমাকে কিছু কথা বলবো আজ।

তুমি হয়তো খেয়াল করেছো গত দুই বছর ধরে জেনেটিক সাইন্স এর বিষয়টিতে প্রতি পরীক্ষাতেই তুমি ৮০% এর উপর মার্ক পাচ্ছ। অথচ তুমি যে পরীক্ষা দিয়েছিলে তাতে তোমার কোন ভাবে পাশ করার কথা।

তুমি গত তিন বছর ধরে জাপান বেইজ জেংফং নামক অর্গানাইজেশন থেকে প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা করে স্কলারশীপ পাচ্ছো। যেদিন জেংফং এর বাছাই পরীক্ষা হয় সেদিন সারা পৃথিবী থেকে কম করে হলেও দশ হাজার পরীক্ষার্থী এতে অংশ গ্রহণ করেছিল।  মাত্র ৯০ জনের মধ্যে  কি করে টিকে গেলে তুমি?

তুমি জানো যুক্তরাষ্ট্র বেইজ ডোমেইন প্রোটোকল বর্তমানে সব ধরনের ইন্টারনেট ফেসিলিটি দিয়ে থাকে। যা দেশের ভিআইপি এবং বিশেষ বিশেষ কিছু ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ পেতে পারে না। তুমি তোমার আইপি চেক করে দেখেছো যে কোন এক অদৃশ্য কারণে একদিন তোমার আইপি এড্রেস চেঞ্জ হয়ে গেছে এবং তুমি দুর্দান্ত গতির একটি সার্ভারে কানেকটেড হয়ে গেছো। তোমার কৌতুহল কম থাকার কারনে এমন ঘটনা কি করে ঘটলো তা নিয়ে তুমি মাথা ঘামাওনি।

এমনি অনেক কিছু দিয়ে গত চারটি বছর আমি তোমার সাথেই ছিলাম। তুমি বোঝনি এক বিন্দুও। আসলে আমি এমনি। তোমাদের সোকল্ড ব্রিলিয়ান্ট বলতে যা বোঝায়। আমি মেধাবি হয়তো ততটা না যতটা কল্পনা প্রবন। আমি কল্পনার জগতে বিচরন করতে পছন্দ করি। বলতে পারো এটা আমার একটা প্যারালাল ওয়ার্ল্ড। 

আমার এ কল্পনার জগত নিয়ে তোমাকে কিছু কথা বলি। তুমি হয়তো জানো আমি খুব শক্তিশালী একটি সার্ভারের সাথে কানেকটেড থেকে সব সময় বিভিন্ন কিছু নিয়ে খোজ খবর করতাম। আমার অসম্ভব মাত্রার কৌতুহল আমাকে দিয়েছিলো এক অতিপ্রাকৃতিক জগত। আমি আমার নিজের বানানো AI দিয়ে তৈরী করেছিলাম এমন একটি ইন্টারফেস যার মাধ্যমে আমার ভাবনাগুলোকে সহজেই ইন্টারনেটের বিশাল জগতের সাথে কমুনিকেট করতে পারতাম। নিমিষেই জেনে নিতে পারতাম আমার প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো।

তুমি কি জানো এ পর্যন্ত আমাদের বয়সি যতগুলো মানুষকে ওরা নিয়ে গেছে তাদের প্রায় সবার খোজ খবরই আমার কাছে ছিলো। তাদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন অস্বাভাবিক ক্ষমতা ছিলো। তার মানে ধরে নেয়া যায় উপর মহল থেকে সবার উপর চোখ রাখা হয় সব সময়। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট আমাদের যোগ্যতাই আমাদেরকে এভাবে নিয়ে যাওয়ার মুল কারন।

এক্ষেত্রে তোমার কোন আশংকা নেই। কারণ তোমার মধ্যে কোন অস্বাভাবিক ক্ষমতা নেই।

শেষ করার পুর্বে তোমাকে একটা তথ্য দেই। করোনা ভাইরাসের উপর আমার কিছু নিজস্ব আর্টিক্যাল ছিলো। মেইলের সাথে এটাচ করে দিলাম। আর্টিক্যালগুলো গোপন রেখো।

শেষ করছি। হয়তো এটাই তোমার সাথে আমার শেষ কথা। 

কি ‘হয়তো’ বলাতে হাসছো? তোমাকে বলেছিলাম যে আমার একটা কল্পনার জগত আছে, সে জগতটা আমার কাছে কল্পনা হলেও বাস্তবের চাইতেও বাস্তব। সেখানে আমি দুরন্ত বিকেলে দুই পাশে বেণী ঝুলিয়ে পুকুর ঘাটে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছি। আরিয়ান নামের কৈশর পেরুনো ছেলেটি সাঁতরে যাচ্ছে পুকুরের মাঝে ফুটে থাকা টকটকে লালপদ্ম ছিড়ে আনবে বলে।


সচরাচর আমার মন খারাপ হয়ে দীর্ঘস্থায়ি হয় না। এবার হলো। আমি মন খারাপ করে দুদিন কোন কথা বল্লাম না। ঘরের কোনে চুপকরে বসে রইলাম। মা খাবার জন্য ডাক দিচ্ছে সেদিকেও তেমন কোন আগ্রহ নেই। ব্রিলিয়ান্ট না হবার কারনে হয়তো আমি কোন কিছু সহজে নিতে পারি না। আমার মাথার ভেতরের নিউরনে লম্বা সময় অতিবাহিত হয় সুক্ষ্ম ব্যপারগুলো এডজাস্ট করতে। 

সামান্থার মেইলের এটাচমেন্ট ফাইলগুলো দেখলাম। সেখানে তার রিসার্চের অনেক ডকুমেন্ট রয়েছে। একটা ডকুমেন্ট এর উপরে লেখা আছে “টপ সিক্রেট”। এটি খুলতে চাইলে দেখলাম এতে পাসওয়ার্ড প্রটেক্ট করা। কিন্তু কোথাও পাসওয়ার্ড এর কোন হিংস পেলাম না। তাই ওটার আশা বাদ দিয়ে অন্য ডকুমেন্টগুলো ভালো করে লক্ষ করলাম। করোনাভাইরাসের উপর গত দশ বছরের বিভিন্ন গবেষনার ফলাফল, বিভিন্ন বিশ্লেষন, বিভিন্ন তথ্য দেয়া আছে। কিছু কিছু তথ্য আমাকে বিস্মিত করলো। 


কয়েকটি তথ্য এমন-

-- প্রায় ৪ বছর হলো করোনা নামক একটি মারন ভাইরাস উপর্যুপরি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অসহায় ভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে এই ক্ষুদ্র ভাইরাসটির কাছে শক্তিশালি মানুষ আজ অসহায়। এটি এতটাই মারাত্মক যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এদেরকে কিছুই করা যাচ্ছে না। 

-- গত ৭ বছরে পৃথিবী ক্রমশ মানব শূন্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। গোপন একটি মাধ্যমে তথ্য পেলাম করোনাভাউরাস নিয়ে গবেষনায় নিয়োজিত মানুষগুলো দ্রুত মৃত্যুর মুখে ঢলে পরছে। অত্যাধুনিক পোষাকও তাদেরকে রক্ষা করতে পারছে না। কি এক অভিনব পদ্ধতিতে সেফটি জারের ভেতরে রাখা ভাইরাসের সেম্পলগুলো বাইরে বেড়িয়ে এসে আক্রান্ত করছে সবাইকে। যদিও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এখনো এ ব্যপারে কিছুই জানেনা। শুধু গবেষনা সংশ্লিষ্ট ও  সর্বোচ্চ কাউন্সিলের কর্তা ব্যক্তিরা ছাড়া।

-- বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষনা প্রতিষ্ঠানটি (ইইসিইউ) এতি মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিজ্ঞানী এবং কর্মীদের হারিয়েছে। বিভিন্ন দুর্বলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

-- শেষ পর্যন্ত ইইসিইউ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যদিও গোপন সুত্রে জানা গেছে ইইসিইউ বন্ধ করা হয়নি, মুলত এটিকে আরো শক্তিশালি করে অতি গোপনে এবং আন্তর্জাাতিক মানের ল্যাবরেটরিতে রুপান্তর করে খুব গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এবং সেখানে নতুন নিয়মে কাজ শুরু হয়েছে। ব্যপারটি আশা ব্যঞ্জক হলেও অতি গোপন একটি তথ্য আমাকে বিচলিত করছে।

-- গত আট বছর করোনা জিনোম এর উপর অসংখ্য গবেষনা করেছে পৃথিবীর হাজার হাজার ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা। এ দীর্ঘ সময়ের গবেষনা এবং প্রচেষ্টার ফলে যা যা হয়েছে-

--১। করোনা এ পর্যন্ত প্রায় ৪৩২১ বার  তার জিনের মধ্যে পরিবর্তন করে নিয়েছে।  কারন, এর জিনোমের প্রথম দুই-তৃতীয়াংশ ট্রান্সক্রিপটেজ পলিপ্রোটিন এনকোড করে। ট্রান্সক্রিপটেজ পলিপ্রোটিন নিজে থেকেই ভেঙে গিয়ে অ-গাঠনিক প্রোটিন গঠন করে।

--২। যতবার এর ভেকসিন তৈরী করা প্রয়োগ করা হয়েছে ততবারই সেই ভেকসিনের এন্ট্রিবায়োটিক কোডগুলোকে সে নিজের জিনোমের সাথে এডজাষ্ট করে নিয়েছে।

--৩। প্রথম দিকে বিভিন্ন পরিবেশে করোনা বেচে থাকায় ঝুকি ছিলো। যেমন ২২ ডিগ্রি সে: তাপমাত্রার উপরে। সাবান কিংবা ক্ষার যাতীয় কিছু সংস্পর্শে। কিন্তু এখন এসব পরিবেশে ভালো ভাবেই বেচে থাকতে পারছে এরা। 

--৪। ভয়ংকর ব্যপার হলো প্রথম পর্যায়ে করোনা আকারের চাইতে ভারি হওয়াতে বাতাসে মাধ্যমে ছড়াতে পারতোনা। কোননা কোন বাহকের মাধ্যমে এটি ছড়াতো। কিন্তু এখন তাদের ওজন আগের চাইতে তুলনামুলক কমে যাওয়াতে এরা এখন বাতাসের মাধ্যমেও কিছুদুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পরতে পারে।


#

গত ক’বছরে আমি এই ভাইরাসটি নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা এবং খোজখবর নিয়েছি। বলা যায় গবেষনা করেছি। যদিও আমি গবেষক নই। কিন্তু আমি অনেক কিছুই কিভাবে জেনো সহজে বুঝতে পেরে যাই। বেশ কিছু ব্যপার আমার মাথায় এসেছে। ভাইরাসটির জিনোম নিয়ে আমি প্রচুর গবেষনা করেছি। আমার কেনো যেনো মনে হয়েছে ভাইরাসটিকে আমরা যে পথে দমন করতে চাচ্ছি সে পথে আমরা সফল হবোনা। আমাদেরকে অন্য কোন পথ দেখতে হবে। আমার মাথায় বার বার একটি বিষয় আসছে আসছে করেও আসছে না। আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে সহজ কোন পথ রয়েছে। 

#

আমি জানি পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য বিশ্বের সকল উন্নত মাথাগুলো এক করে SOW নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পৃথিবীর সকল শক্তি এবং অর্থ ব্যায় করে কাজ করে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ওরা প্রতিটি দেশে একটি করে ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেছে। গোপন সংস্থাটি দেশের ভালো মানের বিজ্ঞানী এবং ডাক্তার সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের খুজে বের করে নিয়ে আসছে সেই অতি গোপন SOW এ। 

#

লক্ষ করলাম বেশ ক বছর ধরে ওরা অপেক্ষাকৃত কম বয়স্ক এবং মেধায় অত্যান্ত জিনিয়াসদেরকে ডেকে নিচ্ছে। প্রথমে বুঝতে পারছিলামনা ওরা কি করে মানুষগুলোকে খুজে বের করছে। কিন্তু যখন আমার পরিচিত কিছু মানুষদেরকে ওরা ডেকে নিলো তখন চিন্তা করার প্রয়াশ পেলাম। দেখলাম যাদেরকে ওরা ডেকে নিচ্ছে তাদের বয়সের যেমন একটা মিল রয়েছে তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে ওরা অনেক মেধাবী। বিশেষ করে ওদের অনলাইন ডাটা বেইজ এবং ব্লগগুলোতে ওদের অস্বাভাবিক মেধার পরিচয় পাওয়া যায়।

#

---মনে হচ্ছে উচ্চ মাত্রার একটি ল্যাবরেটরি এবং কিছু তুখোড় ব্রিলিয়ান্ট পেলে আমি করোনার ভেকসিন নিয়ে আমার মনে উকি দেয়া অজানা ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রুপ দিতে পারবো। 

##

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম আমি তাদের সাথে যোগ দেবো। যদিও জানি এটা আমার একটা সুইসাইড সিদ্ধান্ত। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। চারিদিকের হাহাকার দেখে দেখে মরার চাইতে চেষ্টা করে মরা অনেক ভালো। এখন জানি আমি কি করলে আমাকে তারা ডেকে নিবে। সে অনুায়ী আজ আমি করোনার জিনোম এর উপর করা গবেষনার একটা অংশ অনলাইনে সাবমিট করবো।

#

কি আশ্চার্য আমার আর্টিক্যাল পোষ্ট করার ৩ ঘন্টা অতিক্রম করেছি। রাত ৩:১৭ তে পোস্ট দিয়ে ঘুমাতে গিয়েছি, সকাল ৬টায় মেইল চলে এসেছে। 



---

অতিমাত্রায় বিস্ময় নিয়ে সামান্থার পাঠানো তথ্যগুলো পড়া শেষ করলাম। গত কদিন বেশির ভাগ সময় ভেবে কাটিয়েছি। অল্প ঘুম হয়েছে, কিন্তু ছাড়া ছাড়া স্বপ্নর মধ্য দিয়ে। মানুষের প্রতি, জাতীর প্রতি কতটুকু ডেডিকেডেট হলে মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে? নিজেকেই প্রশ্ন করছি। সামান্থা ইচ্ছে করে সুইসাইড স্টেপ নিয়েছে। অবশ্য এটা নেয়ার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা এবং যোগ্যতা ওর আছে। 

কিন্তু বুঝে পাচ্ছিনা সামান্থা এগুলো আমাকে জানালো কেনো? কেনো সে আবেগ দিয়ে চিঠিটা লেখলো? চিঠিটা আমি এপর্যন্ত কয়েকবার পড়েছি। আমি বুঝতে পারি সে যাওয়ার আগে আমার প্রতি তার আগ্রহ বোঝাতে চেয়েছে। কিন্তু কেনো?

আমার যদি তার মতো মেধা থাকতো তবে হয়তো এমন একটি কাজে অংশ নেয়ার জন্য আমিও চেষ্টা করতে পারতাম। হয়তো সেই সুবাদে তার সাথে দেখা হবারও একটা সুযোগ হতো। কিন্তু এখন আমিতো কিছুই করতে পারবো না।

দিন কাটছে চরম অস্থিরতা নিয়ে। চিঠির কথাগুলো আমাকে উপর্যুপরি অসুস্থ করে ফেলছে। ‌ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুমের মধ্যেও শান্তি নেই। স্বপ্নে জগতে চলে গেলাম।

-বিশাল এক ল্যাবরেটরি। বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরী করা হয়েছে বিশাল এক গবেষনার জগত। অসংখ্য মানুষ সেখানে ব্যস্ততম সময় কাটাচ্ছে। গবেষনা করে বের করার চেষ্টা করছে পৃথিবীতে মানুষ বেচে থাকার রক্ষা কবচ। হঠাৎ করেই একপলক চোখে পরলো সামান্থাকে। দুগ্ধ ফেনিল পোষাকে তাকে অপার্থিব কিছু বলে মনে হচ্ছে। গভির মনোযোগ দিয়ে ডেস্কে বসে মাইক্রোস্কোপ এর ছোট্ট ফানেলে চোখ লাগিয়ে কি যেনো পর্যবেক্ষন করছে। হঠাৎ করেই কাজ থামিয়ে মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি কিছুটা বিব্রত বোধ করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম সে আমাকে হাতের ইশারায় ডাকছে। আমি বল্লাম, আমিতো আসতে পারবো না। দেখোনা শক্ত কাচেঁর দেয়াল। সে তখন আমাকে লক্ষ করে বললো- কে বলেছে পারবে না? পারবে। চেষ্টা করো। আমি বিস্ময়ে বল্লাম- কি করে পারবো। সে উত্তরে বলল- পারবে, চেষ্টা করো।


ঘুম ভাংগার পরও মাথা থেকে “চেষ্টা করো” কথাটা যাচ্ছেনা। বার বার মাথায় বাজছে। 

মা রাতের খাবার খেতে ডাকছে। 

  • খেয়ে যা, দুপুরে কিছু খাসনি।

  • ক্ষিধে নেই মা, তুমি খেয়ে নেও।

  • খেতে আয়, না খেয়ে থাকলে কোন লাভ হবে না। ভাবনা চিন্তা করতে ব্রেনের অনেক এনার্জি খরচ হয়। আর সেই এনার্জি আসে খাওয়া থেকে। না খেয়ে থাকা মানে তোর চিন্তাগুলোকে দুর্বল করে দেয়া।

আমি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা কি কোন ভাবে আমার মনের কথাগুলো রিড করতে পারছে? সেকি কোনভাবে বুঝতে পারছে আমি কোন বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত?

  • হ্যা, আমি জানি তুই সামান্থার চলে যাওয়া নিয়ে ভাবছিস, সাথে সাথে সময়ের এই দুর্যোগ মুহুর্তে তোর কি করা উচিত তা নিয়েও ভাবছিস। আমাদের মা’দের অনেক কিছুই বুঝতে হয়। এখন আয়, খেতে আয়।

আমি আবারো অবাক হলাম আমার মনে কথাগুলো ঠিক ঠিক আম্মু বুঝতে পারছে দেখে।

আম্মুর পেছন পেছন আমাদের ছোট্ট ডাইনিং রুমে ঢুকলাম। দুজন থাকি বাসায়। বাবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় ৪ বছর আগেই। মা একটা আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করে।  বেশিরভাগ এনজিও গুলো অনলাইন বেইজড হওয়াতে এখন বাসায় বসেই কাজ করা যায়। বাইরে যেতে হয় না। 

  • মা, আমি কেনো অন্যদের মতো মেধাবি হলাম না? আমি কেনো জটিল কিছু বুঝিনা?

  • কে বললো তুই জটিল কিছু ভাবতে পারিস না? কদিন ধরেতো ভাবছিস?

  • মা, তুমি কি করে জানো আমি জটিল কিছু ভাবতে চেষ্টা করছি? 

আমি বিস্ময়ে অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। 

  • আরিয়ান, তুই এখন বড় হয়েছিস। নিজের ভালো মন্দ বুঝতে শিখেছিস। এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে তোকে নিয়ে আমি এ পর্যন্ত এসেছি। আমাকে অনেক কিছুই করতে হয়েছে। অনেক কিছুই জানতে হয়েছে। খাওয়া শেষ কর। এখন আর কোন কথা না।


আমি দ্রুত খাওয়া শেষ করলাম। গোছানে শেষ করে আম্মু আমাকে নিয়ে তার ঘরে গেলেন। আমার খুবই পরিচিত ঘর এটি। কিন্তু আজ মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলাম। এঘরে আমি আসিনা বল্লেই চলে। মা সারাাদিন তার অফিসের কাজ করে কম্পিউটার বসে। আমার হাত ধরে আম্মু বিছায় গিয়ে বসলো। আমার মাথায় হাত দিয়ে আমার এলামেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিলো।

  • তোর আব্বু একজন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। Behavioural genetics এর উপর গবেষনা করতেন তিনি। আর আমি তোর আব্বু মারা যাবার পুর্ব পর্যন্ত তার সহায়ক হিসেবে গত প্রায় ১১ বছর কাজ করেছি। আমরা দুজনেই West Virginia University তে একসাথে রিসার্চ করেছি। একটি বিশেষ কারনে আমরা আমাদের রিসার্চ শেষ না করেই দেশে চলে আসি। আমাদের রিসার্চ সংক্রান্ত সকল রেকর্ড গোপন করে আমরা সাধারণ জীবন যাপন করতাম। তোর আব্বু অবশ্য বাসায় তার নিজস্ব ল্যাবরেটরীতে গবেষনা করতো। কিন্তু এটা আমরা অন্য সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলাম।


আমি অবাক হয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছে আমার সামনে সম্পুর্ণ নতুন একজন মানুষ বসে আছে। এমন তথ্য কি করে আমার কাছ থেকে এতোদিন আড়াল করে রাখলো আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না। চোখের সামনে সহজ সরল আব্বুল মুখটা ভেসে উঠলো। আমি জানতাম আব্বু তেমন কোন কাজ করেন না। আব্বু তার নিজের রুমে বসে রাত দিন কি নিয়ে যেনো পরে থাকতো। আমি এ নিয়ে তেমন কোন মাথা ঘামাতামনা। 

  • তোমরা আমার কাছ থেকে এগুলো লুকিয়ে রেখেছিলে কেনো?

  • তোর আব্বু জিন তত্বের আচার আচরন নিয়ে গবেষনা করতেন। গবেষনার এক পর্যায়ে তিনি  জিনোম এর কিছু আশ্চার্যকর বৈশিষ্ট্য আবিস্কার করেন। এ আবিস্কার প্রচলিত বেশির ভাগ আবিস্কারকে ভুল প্রমান করে। সে সময় আমরা West Virginia জেনেটিক ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করছি। তোর বয়স তখন মাত্র ৫ বছর। তোর আব্বু চাইলো তার এ আবিস্কারটি সবাইকে জানাতে। আমাদের সামনে মাত্র ৪ মাসের সময় বাকি। এর মধ্যেই রিসার্চ জমা দিতে হবে। হঠাৎ করে আমি বেকে বসলাম। তোর আব্বুকে বল্লাম রিসার্চ জমা না দিতে এবং দেশে ফিরে আসতে। 

  • কেনো আম্মু? তুমি কেন এমনটি করতে চাইলে?

  • কারণ সেই সময় আমার দু সেমিস্টার আগে আমার এক বন্ধু Human Phycology এর উপর রিসার্চ জমা দেয়। সেটি চলমান কিছু বিষয়ের সার্থে কিছুটা সাংঘষ্টিক ছিলো। কিন্তু ইউনিভার্সিটি তার রিসার্চকে এপ্রুভ করে নেয়। এরপর শুরু হয় সাড়া পৃথিবী জুড়ে হৈচৈ। এক পর্যায়ে ইউনির্ভাসির্টি উভয় সংকটে পরে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা সে রিসার্চকে স্থগিত করে দেয়। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সে রিসার্চ এর সাথে জড়িত ৬ জনই পরবর্তি কয়েক দিনের মধ্যে মারা যায়। তোর আব্বুল রিসার্চ ছিলো আরো ভয়বহ রকমের তথ্যসম্মবিলত। আমি তোর আব্বুকে বোঝালাম। আমাদের ভবিষ্যতের কথা বল্লাম। বিশেষ করে তোর কথা বল্লাম। তোর আব্বু এরপর আর দ্বিমত করেননি। তখন আমরা সব গুটিয়ে দেশে চলে আসি।


আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমার আম্মুর দিকে। শুধু মাত্র আমার নিরাপত্তার জন্য জীবনের সব চাইতে বড় আবিস্কার গোপন রেখেছেন। আমার আব্বুর মুখটা চোখে ভেসে উঠলো। 

  • আব্বু মারা গেলেন কিভাবে? সবার মতো আমিও জানি আব্বু ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

  • হ্যা, তোর আব্বু ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েই মারা গেছেন। কিন্তু সাধারণ কোন ফ্লু নয়।

  • তবে কি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিরো আব্বু?

  • আমরা যখন দেশে ফিরে আসি তখন জীবিকার তাগিদে আমাকে বাইরে চাকুরী নিতে হয়েছে। তোর আব্বু নিজ ঘরে ল্যাবরেটরি বানিয়ে গবেষনায় মন দিলেন। আমাদের অসমাপ্ত রিচার্স শেষ করার জন্য প্রান পন চেষ্টা করতে লাগলেন। যেহেতু এখানে উন্নত ল্যাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা নেই সেহেতু তার কাজ অনেকটা ধীর হয়ে এলো। আমার একার চাকুরীর আয়ে সংসার এবং তোর স্কুলের খরচের পর গবেষনার চালানোর জন্য কিছু থাকে না। এরি মধ্যে পৃথিবীতে এলো করোনা নামের মারন ভাইরাস। তোর আব্বু সিদ্ধান্ত নিলো তার জীবনের সকল পরিশ্রম এবং মেধা সে লাগাবে করোনার উপর গবেষনা করে। শুরু হলো তোর আব্বুর পরিশ্রমের জীবন। রাত দিন করোনার সকল জিনোম ডায়াগ্রাম, এর ইনভেলপ, আক্রান্ত ব্যক্তিদের সিমটম, সহ সকল কিছু নিয়ে গবেষনা শুরু হলো। এক পর্যায়ে করোনা ভাইরাস এর সেম্পল জোগাড় করে নিয়ে আসা হলো আমাদের ল্যাবরেটরিতে। কিন্তু যেহেতু এটি একটি মারাত্মক ভাইরাস সেহেতু এর জন্য সর্বচ্চ প্রটেকশন ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো। আমরা কোন ভাবে কাজ চালাতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমরা আশ্চার্য হয়ে লক্ষ্য করলাম আমাদের রিসার্চ করা সবগুলো থিউরী সত্য প্রমান করছে এই করোনা ভাইরাস। আমরা আগ্রহী হয়ে উঠলাম। বিশেষ করে তোর আব্বুর আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে আমাদেরকে থামতেই হলো। কারণ যে বিশেষ কিছু যন্ত্র এবং ব্যবস্থাপনাগুলো দিয়ে এ ভাইরাসের জিনোম বায়ো ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে সেগুলো যোগাড় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

  • তখন কি করলে তোমরা? গবেষনা থামিয়ে দিলে?

  • গবেষনা অবশ্য আমরা থামাইনি। কোন রকমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আজ থেকে প্রায় ৫ বছর আগে তখন তোর বয়স ১৫ কি ৬ বছর। এস.এসসি পরীক্ষা শেষ করেছিস। তোর কিছু বন্ধু এলো আমাদের বাসায়। তাদের সাথে সামান্থাও এলো। তোর বন্ধুরা যতখন ছিল আমাদের বাসায় ততক্ষণে কয়েকবার সামান্থা তোর আব্বুর ল্যাবরেটরিতে উকি মারলো চরম কৌতুহলে। পরদিন তুই তখন বাসায় নেই, সামান্থা আবার এলো আমাদের বাসায়। সে এসেই তোর আব্বুর ল্যাবরেটরিতে গেলো। তোর আব্বু যদিও বাইরের কেউ ল্যাবরেটরিতে আসুক এটা পছন্দ করত না, কিন্তু তারপরো মেয়েটার আচরেনে এমন কিছু ছিলো যে তাকে না করতে পারলো না।

  • এখানে কি নিয়ে গবেষনা করেন আপনি? _সামান্থা।

  • এই ছোট মেয়ে, তুমিকি বুঝবে আমার গবেষনার বিষয় সম্পর্কে বললে? _তোর আব্বু।

  • আমি ছোট না আংকেল, আমার বয়স ফিফটিন প্লাস। তাছাড়া এবার আমি এস.এসসি’তে বোর্ড ষ্ট্যান্ড করেছি।  আমাকে বলতে পারেন। আমি বুঝবো। _সামান্থা।

  • তবু্ও, এগুলো বুঝতে হলে তোমাকে আরো কিছুটা বড় হতে হবে।

  • আমি জানিনা আংকেল আর কত বড় হবার কথা আপনি বলছেন, আর কেনই বা বলছেন। কিন্তু এটা বলতে পারি আপনার টেবিলের উপর কিউবিক সন্ট্রির যে জারটা আছে সে জারটা ২৭ থেকে ৩৬ কিলোবেইস আকারের করোনা  ভাইরাসকে আটকে রাখার ক্ষমতা রাখে না। এটা রিস্কি।


এ কথা শুনার সাথে সাথে তোর আব্বু আৎকে দুই হাত পেছনে চলে যায়। দুচোখ বিস্ফারিত করে সামান্থার দিকে তাকিয়ে থাকে। এদিকে সামান্থা বলে চলেছে-

  • টেন্থ জেনারেশনের কোর এলেভেন প্রসেসর এর যে কম্পিউটার আপনি রিসার্চ এর ডায়াগ্রাম লুপিং এবং ডিকোডিং এ ব্যবহার করছেন তা আপনাকে সঠিক মাত্রায় ফলাফল দিতে পারবে না। 

আর আপনার Electron SU9000 মডেল এর মাইক্রোসকোপ দিয়ে নিউক্লিওক্যাপসিডকে এনকোড করে সঠিক  রিডিং ফ্রেম বের করে দিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

  • এ পর্যায়ে তোর বাবা সামান্থার হাত খপ করে ধরে জোড় করে নিয়ে চেয়ারে বসায়। অনেকখন তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি তখন তোর বাবার সাথেই ছিলাম। আমাকে লক্ষ করে তোর বাবা বলে-

  • এই মেয়ে কি বলছে আরিয়ানের মা? তুমি কি কিছু বুঝতে পারছো?

  • আমি বল্লাম, হ্যা আমি জানি মেয়েটি কি বলছে। কারণ মেয়েটি অন্য সাধারণ মানুষের মতো না। গতকাল যখন ও আমাদের বাসায় এসেছে বার বার তোমার ল্যাবরেটরিতে উকি দিচ্ছিলো তখনই আমার কৌতুহল হয়, অন্য সবাই আড্ডায় ব্যাস্ত অথচ এই মেয়ে তার সকল মনোযোগ দিয়ে ল্যাবরেটরিতে কৌতুহল নিয়ে যাবে কেনো? আমি গতকাল রাতেই সামান্থার অনলাইন প্রোফাইল দেখি। খুব বেশি আশ্চার্য হবার কোন তথ্য সেখানে নেই। দুবার বোর্ড ষ্ট্যান্ড করেছে আর আরটিফিশিয়াল  জেনেটিক্স এর দুটি ওয়ার্ক শপে সে নেশনাল এয়ার্ড অর্জন করেছে। এ তথ্যগুলো খুব বেশি চোখে পরার মতো কিছু না। কিন্তু আমার কৌতুহল হলো আরো কিছু জানার জন্য। তাই আমি আমার অর্জানাইজেশেনের সিনিয়র সাইবার স্পেশালিষ্টকে কাজে লাগালাম। তখন জানলাম এই মেয়ে ইতিমধ্যে জেনেটিক্স এর মধ্যকার প্রোটিনের ইনক্রিপটেড ডাটাকে প্রায় ৬০% ট্রান্সক্রিপ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল একটি অতি গোপনীয় ফ্রেমওয়ার্কে সে এই তথ্যর উপর একটি স্ক্রিপ্ট জমা দিয়েছে।


আমি বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার সহজ সরল জীবনের আশে পাশে এতোকিছু হয়েছে হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।

  • তোর বাবা আমি আর সামান্থা মিলে একটি আলোচনায় বসলাম। সামান্থা বলো-

  • আমার সম্পর্কে যা জানার তাতো আপনারা জেনেই গিয়েছেন। এবার আপনাদের সম্পর্কে খোজ নিয়ে যা জেনেছি তা হলো-

  • এই বলে সামান্থা আমাদের মোটামুটি সকল তথ্য গরগর করে বলে গেলো। 

  • সে বলল, আমি জানি এই মুহুর্তে করোনাভাইরাসের জেনেটিক বিহেভিয়ার নিয়ে আপনারা গবেষনা চালাচ্ছেন। কিন্তু আপনারা এটা কাউকে জানাতে দিচ্ছে চাচ্ছেনা না। যাই হোক এতে আমার কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আপনারা যেভাবে চেষ্টা করছেন তা সফল হবার সম্ভাবনা শুন্যের কাছাকাছি।

  • এপর্যায়ে তোর বাবা বলল- আমরাও জানি আমাদের আয়োজন খুবই অপ্রতুল। কিন্তু কি করতে পারি বলো? আমাদের আর্থিক কোন সাপোর্ট নেই। তাছাড়া গোপনীয়তা বজায় রাখতে হলে আর্থীক সহায়তা পাবার কোন সুযোগ নেই।

 সামান্থা বললো-

  • আমার একটা প্রস্তাবনা আছে। আপনাদের সব কিছু শতভাগ গোপন থাকবে এই শর্তে আমি আপনাদের আর্থিক সহ সব ধরনের সহায়ত দিবো। কোথ্থেকে কিভাবে দেবো এটা আপনাদের দেখতে হবে না, কিন্তু নিশ্চিত থাকবেন আমাদের তিনজনের বাইরে এর কথা কেউ জানবে না। কিন্তু শর্ত এটাই থাকবে। যেহেতু আমি জিনোম নিয়ে কাজ করছি এবং আপনারাও কাজ করছেন সেহেতু আমরা যদি একত্রে কাজ করি তবে এর ফলাফলটা তুলনামুলক দ্রুত আসবে।

  • আমরা অবাক হয়ে সামান্থার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আগে হলে হয়তো তোর আব্বু এটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতো। কিন্তু সেই মুহুর্তে সামনে বসা এই পিচ্ছি মেয়েটাকে পিচ্ছি বলে হেলাফেলা করা যাচ্ছে না।  আমরা এক দিন ভেবে দেখার জন্য সময় চাইলাম। 

  • একদিন নয়, সেদিন রাতেই আমরা সামান্থাকে ফোনে জানিয়ে দিলাম গোপনীয়তার শর্তে আমরা তার কথায় রাজি।

  • যেহেতু আশেপাশে কি হচ্ছে সেসব নিয়ে তোর কৌতুহল কম সেহেতু তুই এই ব্যপারগুলো ধরতে পারিসনি। তাছাড়া আমরাও চাইনি তোকে এসবে জড়াতে। এরপর আমাদের বাসায় সর্বোচ্চ স্পিডের ইন্টারনেট কনেকশন, প্রায় সুপার কম্পিউটারের গতিশিল কম্পিউটার, ল্যাবরেটরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এসে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই। সামান্থাই সব ব্যবস্থা করেছে।

  • অবসর সময় পেলেই আমরা তিনজন মিলে আলোচনা করতাম। তোর আব্বু জেনেটিক বিহেভিয়ার নিয়ে, সামান্থা ডিকোডিং নিয়ে আর আমি তাদের মধ্যকার সমন্বয় এবং সহায়ক হিসেবে কাজ করে যেতে লাগলাম। 


আমি আম্মুল দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুদ্ধের মতো শুনছি। মনে হচ্ছে আম্মু গল্প বলছে। হঠাৎ মনে হলো আম্মু চুপ করে গেছে। আমি তখন কৌতুহলি হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

  • আব্বু মারা গেলো কেমন করে?

  • একটা ছোট্ট ভুলের জন্য এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। সেদিন আমি কিংবা সামান্থা কেউই ল্যাবে ছিলাম না। তোর আব্বুর অসতর্কতার কারনে সেম্পল এর জার এর সীল্ড কাভারটি একটু সরে যায়। তোর আব্বু হয়তো অন্য মনস্ক ছিলো। কাভারটি সে পুনরায় জায়গা মতো দিয়ে রাখে। কিন্তু ততখনে ভাইরাস তোর আব্বুর হাতে লেগে যায়। যেহেতু তখন করোনা ভাইরাস ডিটাকটর ছিলো আমাদের ল্যাবে সেহেতু কিছখনের মধ্যেই জানতে পারি তোর আব্বু ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। যেহেতু তোর আব্বুর ফুসফুসে সমস্যা ছিলো আগে থেকেই সেহেতু ৩ দিন যেতে না যেতেই তিনি মারা জান।

আম্মুর চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে আসে। আমি তাকিয়ে থাকি তার  দিকে। কত বড় বড় ধাক্কা খেয়েছে আম্মু। 


---

লম্বা সময় ঘুমিয়ে কাটালাম। ঘুম না বলে তন্দ্রা বলা যায়। ঘুমের মধ্যে অন্য আর এক জগত চলে আসে। সেখানে আব্বুকে দেখলাম মন খারাপ করে বসে আছে। আম্মুকেও দেখলাম সাথে সাথে। তারও কেনো যেনো মন খারাপ। বায়োস্কোপের মতো এক দিক দিয়ে এসে এসে মানুষগুলো অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই সামান্থার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা ভেসে উঠলো। সে অবশ্য থেমে নেই। হাত নেড়ে কিযেনো আমকে বলার চেষ্টা করছে। আমি সামনে ঝুকেও কিছু শুনতে পাচ্ছি না। আরো কতোশত হাবিজাবি দেখে ঘুম ভাংলো।

ঘরের এক কোনে হাটুতে মুখ গুজে বসে রইলাম। মাথায় যে চিন্তাগুলো আসছে সেগুলোকে এক সুতায় সাজাতে চেষ্টা করলাম। আব্বু, আম্মু, সামান্থা আমার কাছে কিছু চাচ্ছে। ওদের মধ্যে একজনন মৃত, একজন ধরাছোয়ার বাইরে, আর শুধু মাত্র আম্মু আছে পাশে। 

আমার যথারীতি চিন্তাগুলোকে একটু উল্টেপাল্টে ভাবতে চেষ্টা করলাম। জ্ঞান হবার পর থেকেই আমি জানি অথবা আমাকে বোঝানে হয়েছে যে, আমি অতি স্বাধারন একটি মানুষ। আমার মধ্যে অতিরিক্ত কিংবা অতিমাত্রায় কিছু নেই। আমার আম্মুর যুক্তি হলো সে চেয়েছে তার ছেলেকে স্বাভাবিক ভাবে বড় করতে এবং অন্য দশ জন স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন চালাতে শিখতে। আম্মুর সাথে সাথে আব্বুও বোধ হয় এটাই চেয়েছে।

অন্য দিকে আব্বু এমন এক বিষয় নিয়ে গবেষনা করেছেন যা সাধারণ কোন বিষয় নয় কিংবা সাধারণ মানুষ এসব বিষয় নিয়ে গবেষনা করার যোগ্যতা রাখেনা। তার মানে আমার আব্বু অসাধারণ এবং ব্রিলিয়ান্ট লোক ছিলেন। অন্য দিকে এসব কিছুর মধ্যে আম্মু আমাকে সব কিছু থেকে আগলে রেখেছেন, তার মানে আম্মুও একজন অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেছেন। 

দুজন অসাধারণ মানুষ আমাকে পৃথিবীতে এনেছেন, তাহলে আমার মধ্যে এমন কি কিছু নেই যা আমার আব্বু আম্মুর অসাধারণত্ব বহন করে?

আমি আগ্রহ নিয়ে ভাবনা এগিয়ে নিতে থাকলাম। এখন পৃথিবীর মারাত্মক ক্রান্তি কাল। শত প্রতিকুলতার মাঝেও আব্বু, আম্মু এমনকি সামান্থা পৃথিবীর জন্য কোটি মানুষের জন্য ভেবেছে। তাদের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছে। কাজে লাগাতে গিয়ে একজন মারা গেছে, একজন হারিয়ে গেছে, আর আরেক জন আমার মা সব কিছুর মধ্যে থেকেও তার ছেলেকে আগলে রেখে সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা করার পরিবেশ দিয়েছে। কেনো? আমার কাছে কি তাদের কোন প্রত্যাশা আছে? আব্বুর ছিলো কিনা জানিনা, কিন্তু সামান্থার ছিলো এটা তার কাছ থেকে পাওয়া চিঠিতে তার অস্পষ্ট প্রমান পাওয়া যায়। কিন্তু আম্মু----। আম্মুকে কেনো আমি জিজ্ঞাস করছি না? দৌড়ে গেলাম আম্মুর কাছে।

আম্মু তার কম্পিউটারে বসে কাজ করছে। তার পেছনে গিয়ে কাধে হাত দিয়ে দাড়ালাম। আম্মু কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালো।

  • কিরে, কিছু বলবি?

  • আম্মু, তোমার সাথে কথা ছিলো।

  • তাহলে একমিনিট দাড়া, আমি ফাইলটা ফরোওয়ার্ড করে নিই।

আমি আর আম্মু সোফায় গিয়ে পাশাপাশি বসলাম। আম্মুর কাছে ঘেষে বসে তার দিকে ফিরে তাকিয়ে রইলাম কিছুখন। আম্মু কপট অবাক হবার ভান করে ভুরু কুচকে আমার দিকে তাকালো।

  • কিরে, এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?

  • আম্মু, তুমি কি বলতে পারো আমার জীবনে এমন কোন কিছু কি ঘটেছে যা অস্বাভাবিক কিংবা এমন কিছু কি হয়েছে যাতে প্রমান হয় আমার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা আছে?

  • হ্যা, আছেতো।

  • কি?

  • তুই ছোট বেলায় বিছানায় হিসু করে দিয়ে আমরা দেখার আগেই ইস্ত্রি দিয়ে শুকিয়ে ফেলতি।

  • মা, ইয়ার্কি না, সিরিয়াসলি বলো।

  • শোন আরিয়ান, তুই যেটা জানতে চাইছিস সেটা জানার জন্য আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নাই। তুই নিজেকে প্রশ্ন কর। আমার বিশ্বাস এ প্রশ্ন তুই কখনো নিজেকে করিসনি। 

  • আমি কিভাবে জানতে চাইবো?

  • এই ধর, তুই যখন খেতে বসে খেতে থাকিস তখন তোর অবচেতন মন তোকে অনেক কিছু খেয়াল করতে দেয়। তোর প্লেটের উপর একটা মাছি এসে বসলে তুই প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে খেয়াল করিস মাছিটি বসে বসে কি করে। সেটি কি করে মাথা নোয়ায়, কি করে দুপাশের দুপা দিয়ে মুখের মধ্যে ঘষাঘষি করি। উড়ে যাবার সময় এটি সমান্তরাল ভাবে উপরে উঠে নাকি বেকে উঠে। আবার তুই যখন কোন মানুষের সাথে কথা বলিস তখন তাদের কথার চাইতে তাদের আচরন কিংবা নড়াচড়া বেশি খেয়াল করিস। কি করে কথা বলে, কত দ্রুত বলে, কি করে হাসি দেয় এসব কিছু তোর মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। আমি নিশ্চিত তুই এই ভাবনাগুলো তোর অবচেতন মন থেকে করিস। তোর স্বাভাবিক চিন্তায় এগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু আমি জানি, তুই এগুলো করিস। 

  • তুমি কিভাবে জানো আম্মু?

  • আমি দীর্ঘ জীবন জিনোম বিহেভিয়াল নিয়ে পড়ালেখা করেছি বাবা। এটা নিয়ে গবেষনায় তোর বাবাকে সহজগিতা করতে গিয়ে আমাকে অনেক কিছু জানতে হয়েছে। আর সেই জানাগুলো আমার মাধ্যে একটি ক্ষমতা তৈরী করেছে। আমাকে জেহেতু ডিএনও আর আরএনএ নিয়ে কাজ করতে হয়েছে, গবেষনা করতে হয়েছে সেহেতু এগুলো এখন আমার কাছে স্বাভাবিক ব্যপার হয়ে দাড়িয়েছে। আমি এখন ভালো ভাবেই জানি তোর আব্বুর সমস্ত চিন্তা চেতনা তোর বংশানুতে জড়িয়ে আছে। হয়তো আমার বৈশিষ্টগুলোও থাকতে পারে। কিন্তু সুপ্ত অবস্থায় থাকা এ বৈশিষ্ট্যগুলো তোর মধ্যে আছে যে, এ ব্যপারে আমি নিশ্চিত। 

  • কিন্তু, আমিতো বুঝিনা, টের পাইনা!

  • আগে বুঝিসনি, কারণ আগে বোঝার প্রয়োজন হয়নি। এখন যদি মনে করিস তোর বোঝা উচিত, তবে অবশ্যই বুঝবি।


আমি আর কোন কথা বলিনি। চুপ করে আম্মুর ঘর থেকে চলে এসেছি। আমার ভাবনার যে দিকটি আম্মু আজ আমার সামনে উম্মুক্ত করেছে সেটার সাথে আমার যে পরিচয় হয়নি তা নয়। কিন্তু সে ভাবনাগুলো আমার কাছে কখনো গুরুত্বপুর্ণ মনে হয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়ার সময় হয়েছে।

আমি একটা খাতা টেনে আমার কর্মপরিকল্পনার একটি গ্রাফ আকার চেষ্টা করলাম। প্রথমতঃ আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম বর্তমান অবস্থা নিয়ে। বর্তমান অবস্থায়ে পৃথিবী যে অবস্থায় আছে সে ভাবে হয়তো আর দুই কি তিন দশক পর পৃথিবী মানুষ শুন্য হয়ে যাবার কথা। আর এর জন্য যে ভাইরাসটি দায়ী সেটিকে নিয়েই আমার আব্বু গবেষনা করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

যে কাজটি আগে কখনো করিনি সেটিই করলাম আজ। আব্বুর ল্যারেটরিতে গিয়ে ঢুকলাম। আম্মুর হাতের যত্নে এটি ধুলা মলিন হয়নি সত্যি কিন্তু এটি যে এখন একটি থেমে যাওয়া প্রাণ তা বোঝা যায়। দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম কোনটার কি কাজ। যদিও এসব বেশিরভাগ কিছুই আমি জানিনা অথবা চিনিওনা। টেবিলের উপর লগ বইটা উল্টেপাল্টে দেখে বোঝার চেষ্টা করে নিরাশ হলাম। এগুলো আমি বুঝিনা। তবে নিত্য দিনের বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট, বিভিন্ন বিশ্লেষন এবং প্রয়োগ মাত্রা লিপিবদ্ধ করা তা বোঝা যায়। লগ বইটা তুলে নিয়ে আম্মুর কাছে গেলাম। আম্মু আমাকে দীর্ঘ সময়ে যা বোঝালো তার সার কথা হলো-


- প্রতিটি প্রানীর বৈশিষ্ট্য তার জিনোমে সংরক্ষিত থাকে। এমনকি শুধু তার নয় তার পুর্বের বংশধারা এবং তাদের বৈশিষ্ট্যও জমা থাকে এই জিনোম এর ডিএনএ ও আরএনএ’তে। যেহেতু আমাদের গবেষনার বিষয় ছিলো জিনোম বিহেভিয়ার অর্থাৎ জিনোম এর বৈশিষ্ট্য এবং এর আচার আচরন নিয়ে সেহেতু আমরা একটি জিনে রক্ষিত সকল প্রকার তথ্যগুলোকে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা এবং গবেষনা করে অনেক ক্ষেত্রে ধারনা করে একটি একটি করে সিদ্ধান্ত পৌছাতাম কোন কোন পর্যায়ে এরা কি কি করে এবং কি কি করেনা। এটা একটি বিশাল দীর্ঘ এবং সময় সাপেক্ষ আর ধৈর্যের কাজ। তাছাড়া আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিলো। যদিও সামান্থার কারনে শেষ এক বছর আমরা অনেক প্রযুক্তিগত সুবিধা পেয়েছিলাম। কিন্তু এসকল হাইটেক এবং বিশ্লেষনধর্মী কাজের জন্য আমাদের ল্যাবরেটরিটা উপযুক্ত ছিলো না। শেষের দিকে আমরা তিনজন এ নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করেছি। বিশেষ করে করোনা মহামারিকে সামনে রেখে আমরা চেয়েছিলাম যদি কোন বিশাল ল্যাবরেটরি ব্যবহার করার অনুমোদন পাওয়া যায়। কিন্তু সামান্থা এবং তোর আব্বুর কারোই এ ব্যপারে কোন আগ্রহ ছিলোনা। কারণটা আমার মনে হয়েছে যে তাদের ধারনা বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করে চলেছে কে এই করোনার প্রতিষেধক আবিস্কার করবে। এবং এজন্য তাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের নোংরা প্রতিযোগিতা। এই নোংরামিতে পরে গিয়ে আমরা বিপদে পরতে চাইনি। শেষের দিকে সামান্থাকে আমি খুব চিন্তিত থাকতে দেখেছি। লম্বা সময় সে ল্যাবরেটরিতে কাটিয়েছে। অনেক তথ্য বিশ্লেষন করেছে। আর মেয়েটার মধ্যে এতো ধৈর্য দেখেছি যে, আমার মনে হয়েছে সে হয়তো মানুষ নয়, কোন সপ্তম মাত্রার রোবট।

- তোর আব্বুর মৃত্যুতে আমাদের গবেষনা সম্পুর্ণই বন্ধ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সামান্থা এসে বসে বসে কি যেনো করতো। তোর আব্বু মারা যাবার পর থেকে আমি আর গবেষনায় মনোযোগ দেই নি। তবুও মাঝে মাঝে সামান্থা ডেকে নিয়ে কিছু বিষয়ে আলোচনা করতো। এক পর্যায়ে সামান্থাকে আমার কিছুটা অন্যরকম মনে হতো। আমার মনে হতো সে কিছু একটা ঘটাতে চাচ্ছে। কিন্তু কি, তা আমি জানতাম না। 

- সামান্থা কি চেয়েছে আম্মু? 

- সামান্থার জেনেটিক্স এর উপর মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা শক্তি রয়েছে। সে সহজেই জিনোম এর এনভেলপ, মেমব্রেন, নিউক্লিওক্যাপসিড ও পলি’র কোড ট্রান্সক্রিপট এনকোড করে এর ভেতরকার প্রোটিন এর গঠন বের করে ফেলতে পারতো। এ কাজে তার জুড়ি নেই। আমি অবাক হয়ে গেছি তার এমন অস্বাবিক ক্ষমতা দেখে। কিন্তু একটি ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরীর জন্য যেমন এগুলো জানা দরকার তেমনি সে ভাইরাসে বিহেভিয়ার সম্পর্কে ভালো ভাবে জানা থাকা দরকার। এক্ষেত্রে সে তোর আব্বুকে পেয়েছিলো। 

তোর আব্বু যখন মারা গেলেন তখন তার চিন্তায় অনেক পরিবর্তন আসে। সে ব্যপারগুলো নিয়ে অন্য ভাবে ভাবে। এবং আমার ধারনা সে সঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছে।

- তুমি কি জানতে যে সামান্থা নিজে থেকেই চলে যাবার চেষ্টা করছে?

- না, স্পষ্ট করে আমাকে ও কিছু বলেনি। কিন্তু আমি অনুমান করতে পেরেছিলাম। আমার সব সময় মনে হয়েছে বিশাল বড় কোন প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে কাজ করার সুযোগ হলে সে হয়তো তার লক্ষ্যে পৌছতে পারবে।

- আম্মু, এখন আমার কি করা উচিত?

- আমি ঠিক জানিনা তোর কি করা উচিত। হয়তো সামান্থা বলতে পারতো।


সামান্থার পাঠানো এটাচমেন্ট ডকুমেন্টগুলো আবার দেখতে লাগলাম। মনে হচ্ছে এখানে কোথাও আমি কোন ইনফরমেশন পাবো যা আমাকে আগামীর পথ দেখাবে।

বেশিরভাগ ডকুমেন্টই ভাইরাস সংক্রান্ত বিভিন্ন নিউজ, রিপোর্ট, আর্টিক্যাল যার বেশিরভাগই আমি তেমন বুঝিনা। টপসিক্রেট ফাইলটাতে ক্লিক করলাম। যথা রীতি পাসওয়ার্ড চাচ্ছে। চিন্তা করার চেষ্টা করলাম-  সামান্থা কেনো আমাকে এমন ফাইল পাঠাবে যাতে আমি ঢুকতে পারবো না? তবেকি এটাতে ঢুকতে পারবো মনে করেই আমাকে সে দিয়ে গেছে? কিন্তু আমি পাসওয়ার্ড পাবো কোথায়? আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম। এমন কোন পাসওয়ার্ড তার জানা আছে কিনা? আম্মু জানালো সে জানেনা। সামান্থার নাম দিয়ে কিংবা যা মনে হতে লাগলো তা দিয়ে পাসওয়ার্ড খোলার চেষ্টা করলাম। ব্যার্থ হলাম। 

আমাকে পাঠানো চিঠিটা নিয়ে বসলাম। দুবার পড়লাম। মনে হলো কিছু একটা চোখে পড়েও পড়ছেনা। খেয়াল করলাম চিঠিতে আমার প্রতি সামান্থার শেষ কথাগুলো। অনেকটা অবেগ নিয়েই লেখাগুলো লিখেছে সে।

“তোমাকে বলেছিনা, আমার একটা কল্পনার জগত আছে, সে জগতটা আমার কাছে কল্পনা হলেও বাস্তবের চাইতেও বাস্তব। সেখানে আমি দুরন্ত বিকেলে দুই পাশে বেনি ঝুলিয়ে পুকুর ঘাটে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকি। আরিয়ান নামের কৌশোর পেরুনো ছেলেটি সাতরে যাচ্ছে পুকুরের মাঝে ফুটে থাকা টকটকে লালপদ্ম ছিড়ে আনবে বলে।”

লেখাটা পড়তে পড়তে আমিও কল্পনার জগতে হারিয়ে গেলাম। বুকের ভেতর কোথাও যেনো চিনচিন করে উঠলো একটা কিছু। চোখের পাতা কেঁপে উঠলো কিছুটা। চিঠির কৌশোর পেরুনো ছেলেটিকে নিজের মধ্যে কিছুটা সময়ের জন্য উপলব্ধি করলাম। আবেগ কিংবা ভালোবাসা যাইহোক আমি এর সাথে পুর্বপরিচিত নই, বুঝতে পারলাম। অজান্তেই পেয়ে হারাবার কষ্ট নোনা জল হয়ে গাল বেয়ে নেমে যেতে লাগলো। আমি অনেকটা অভিভুত আর কিছুটা কষ্ট অনুভব করতে লাগলাম।

ঝাপসা চোখে তাকিয়ে আছি চিঠির দিকে। ভাবনার সমুদ্রে ঝড় বয়ে গেলো। আমি অকুতোভয় মাল্লা হয়ে সে ঝড়ে টিকতে পারলাম না। মাথা নুইয়ে কাঁদতে লাগলাম।

এভাবে কখন যে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ঘুম ভেংগে আবারো চোখ গেলো কম্পিউটার স্ক্রীনে জ্বজ্বলে চিঠিটার দিকে। আমি হঠাৎই লক্ষ করলাম চিঠিটায় কি  যেনো অন্যরকম। কি সেটা বোঝার চেষ্টা করলাম। বুঝলাম সম্পুর্ণ লেখাটা স্বাভাবিক ফন্টে লেখা কিন্তু “লালপদ্ম” কথাটা বোল্ড করা। বৈসাদৃশ্যটা চোখে পড়ায় সোজা হয়ে বসলাম। কেনো এটা মোটা করে লেখা হলো? ভুলে? আমার মনে হলো এটা কোন সংকেত নয় তো, যা আমি খুজছি? বিশাল কিছু পাওয়ার আশায় আনন্দিত হয়ে উঠলাম।

লালপদ্ম অর্থাৎ REDLOTUS. 

টপসিক্রেট ফাইলটিতে ক্লিক করলাম। পাসওয়ার্ড এর ঘরে REDLOTUS লিখে বিসমিল্লাহ বলে এন্টার চেপে দিলাম। সাথে সাথেই স্ক্রীনে সবুজ একটা লেখা উঠলো- ACCESS GRANTED

অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত আমি ফাইলটি খুলতে পেরেছি।



---

আরিয়ান,

জন্মগত ভাবেই আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রবল। আমি খুবসহজেই কোন কিছু দেখে অথবা খেয়াল করে সেটার উপর প্রায় সঠিক একটা ধারনা করে ফেলতে পারি। তোমাকে পর্যবেক্ষণ করে আমার ধারনা হয়েছিলো তুমি অসম্ভব মেধাবি একটা ছেলে। আসলে মেধাবি বলতে সবাই যেমনটি বলে আমি ঠিক তেমনটি মনে করি না। একটা মানুষের সকল দিক দিয়ে একেবারে স্বাভাবিক, কিন্তু দেখা গেলো কিছু ব্যপারে তার ক্ষমতা অস্বাভাবিক। যেমন তোমার আছে একটি দুর্দান্ত কল্পনা শক্তি। তোমার কল্পনার জগতটা অন্য সাধারণ মানুষের মতো না। সেখানে খুব আশ্চার্য জনক কিছু ব্যপার আছে। যাই হোক, আমার কথা সত্য কিনা এটা জানতে চাইলে আমি বলবো, তুমি যেহেতু এই ফাইলটি পড়তে পারছো সেহেতু আমি নিশ্চিত যে তুমি তোমার কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে ফাইলটি এক্সেস করার পথ খুজে পেয়েছ।

আমি যেখানে যাচ্ছি বলতে পারো এটা আমার স্বেচ্ছায় নির্বাসনের মতো। কিন্তু এছাড়া আমার আর কোন পথ ছিলোনা। আমি নিশ্চিত তুমি এরি মধ্যে জেনে গেছো আমার সম্পর্কে অনেক কিছু। 

হ্যা, আমি পৃথিবীর ভয়াল সময়ে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে কিছু একটা করতে চাই যার মাধ্যমে পুরো মানুষ জাতি উপকৃত হতে পারবে। আমি এখনো জানিনা আমি কি করতে পারবো। তবে আমি নিশ্চিত যেখানে আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে সেখানে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত ল্যাবরেটরী। তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ের উপর এক্সপার্টও রয়েছে সেখানে। 

আরিয়ান, তোমাকে একটি জিনিস বলা হয়নি। গত দশ বছর ধরে করোনা ভাইরাস নিয়ে যে গবেষনা চলছে তার মুল তথ্য হলো প্রথম তিন থেকে পাঁচ বছর যে কটি প্রতিষেধক আবিস্কার করা হয়েছিল পরীক্ষামুলক ভাবে সেগুলো প্রথম পর্যায় কাজ করলেও পরবর্তীতে দেখা গেছে ভাইরাসটির নিজস্ব সেল্ফ চেঞ্জিং বিহেভিয়ার এর কারনে খুল অল্প সময়ে ভাইরাসটি তার নিজেকার মধ্যে কিছু পরিবর্তন করে নেয়। যার ফলে সে প্রতিষেধকটি আর কোন কাজ করতে পারে না। এবং এমন করে অসংখ্য প্রতিষেধক ইনএকটিভ হয়ে যাবার কারনে প্রতিষেধক তৈরীতে এক ধরনের অনাগ্রহ তৈরী হয়েছে। এর প্রভাব হয়তো গবেষনার উপর তেমন কোন পরেনি, কিন্তু বিষয়টি গত পাঁচ বছর বিজ্ঞানীদের মাথা ব্যথায় পরিনত হয়েছে।

আর যেহেতু ভাইরাসটি এখন বাতাসের মাধ্যমে কিছুটা দুরত্ব অতিক্রম করতে পারে সেহেতু এর দ্বারা আক্রান্তের সম্বাবনা অনেক বেড়ে গেছে। দেখা গেছে খোদ গবেষনাগারের উন্নত ল্যাবরেটরিতে থাকা মানুষগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে। যার ফলে গত কিছু বছর অনেকগুলো গুরুত্বপুর্ণ এবং অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী এবং স্পেশালিষ্ট করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে চল্লিশোর্ধরাই বেশি আক্রান্ত হয়েছে। যে কারনে বর্তমানে ল্যাবরেটরিগুলোতে অপেক্ষাকৃত বয়সে কম মানুষদেরকে বাছাই করছে।

তোমার আব্বুর থিসিস এর সমস্ত লগ আমি দেখেছি। জেনেটিক যে যে বিষয় নিয়ে আমি বিশ্লেষন করেছি এর প্রতিষেধক তৈরীতে ডায়াগ্রাম তৈরী করায় বার বার আমি একটি জায়গায় গিয়ে থমকে গিয়েছি। করোনা ভাইরাস নিজেকে খুব সুকৌশলে বদলে নিতে সক্ষম, যা পুর্বের কোন ভাইরাসের মধ্যেই দেখা যায় নি। আমার বার বার মনে হয়েছে এই ভাইরাসটির নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা কিংবা বুদ্ধি আছে। আমরা যে সমস্যাটির ক্লিনিক্যালি সমাধারণ করতে চাচ্ছি আমার মনে হয় করোনাকে নিয়ে আমাদেরকে এর বাইরে গিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আর এই ভাবনাতে শুধু ভালো জেনেটিক্স বিশেষক্ষ কিংবা এর বায়োগ্রাফিক্যাল এক্সেস এর উপর অভিজ্ঞ হলেই চলবে না, একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস যখন তার নিজস্ব বুদ্ধি দিয়ে চলতে শিখে যায় সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের আচরন সম্পর্কে কল্পনা করতে পারে এমন এক্সপার্ট মানবিক শক্তিও প্রয়োজন হবে।

আরিয়ান, তোমার মনে আছে বছর খানেক আগে স্কুল থেকে আমাদেরকে “আগামীর ভাবনা’ এর উপর একটি স্মৃজনশীল আর্টিক্যাল জমা দিতে বলেছিলো? তোমার আর্টিক্যালটা আমি পড়েছিলাম। আমি যদি বিচারক হতাম তবে তোমাকে দশে দশ দিতাম। তুমি যদিও তোমার মোট স্ক্রোরের এভারেজ নম্বর পেয়েছিলে। কারন যে নম্বর দিয়েছে সে নিজেও হয়তো তোমার এ লেখাটির মুল্যায়ন করার ক্ষমতা রাখেনি। কিন্তু আমি জানি তুমি তাতে কি লিখেছ। আগামী সম্পর্কে তুমি যে দৃষ্টিভংগি তুলে ধরেছো তা এক কথায় অভুতপুর্ব। এ চিন্তা শক্তি একটি এক্সেপশনাল শক্তি। আল্লাহর সরাসরি দ্বান। তোমার আব্বুর মধ্যে যতটুকু ছিল তোমার মধ্যে এসে তার মাত্রা বরং  বেড়েছে, কমেনি।

জগতের এই চুড়ান্ত দুঃসময়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছি আমরা। তোমরা আমাদেরমতো মানুষগুলোকে জিনিয়াস বলে যে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত আছো, জেনে রাখো- আমাদের মানে সকলের। আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে হয়তো পৃথিবী ধ্বংসকে ঠেকিয়ে দেয়া যেতে পারে।


পুনশ্চঃ হয়তো একদিন সত্যি সত্যিই গভির জল সাতরে  লালপদ্ম তুলে আনতে চাইবে। দেখো কিন্তু, সময় বড্ড বেরহম। ওয়ান ওয়ের মতো একদিকে ছুটে চলে। সেমি বৃত্ত হয়ে একজায়গায় পুনরায় ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই এখানে।

ভালো থেকো, ভালো রেখো।

সামান্থা।


--

সামান্থার সিক্রেট লেটারটা পাবার পর মুল্যবান দুটা দিন চলে গেছে। সিদ্ধান্ত অবশ্যই নেয়া হয়ে গেছে আগেই। কাজে যেতে হবে আমাকে। এতো দিন জানা ছিলোনা যে, আমার কোন কাজ করার যোগ্যতা আছে। কিন্তু এখন আমি জানি, আমি পারি। গত দুদিনে স্পষ্ট হয়েছে সেটা আমাার কাছে। নিজের চিন্তা শক্তিকে সম্পুর্ণ কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আশ্চার্য হয়ে গেছি আমি। আমি মুহুর্তেই জেনে গেছি আমার করণীয় কি। আমি চিন্তা করতে চাইলেই একটার পর একটা অংক তৈরী হচ্ছে আমার নিউরনে। বিশ্লেষন হচ্ছে নেনো সেকেন্ডে। সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগছে কিছু মুহুর্ত মাত্র। আমার অল্প সময়ের বিশ্লেষনে যে সিদ্ধান্তগুলো মাথায় এসেছে সেগুলো ডেসবোর্ডে সাজালে অনেকটা এমন দেখাবে-

১। আমিও পারি

২। এখন সময় বিজ্ঞানকে সহযোগিতা করা

৩। ভাইরাস সম্পর্কে মানবিক বিশ্লেষন করে বিশ্লেষকদের জানানো

৪। প্রয়োজন সর্বোচ্চ মানের গবেষনা ও ল্যাবরেটরি

৫। সামান্থা এটাই চেয়েছে

৬। আমাকে যেতে হবে

৭। যাবার পথ আমাকেই করে নিতে হবে



---

সামান্থার কাছ থেকে পাওয়া গোপন সার্ভারে আমার জীবনের প্রথম আর্টিক্যালটা পোস্ট করেছি মাত্র ক’মিনিট হলো। আমি আমার ক্ষমতাটা একটু যাচাই করতে চেয়েছি। সামান্থা আর্টিক্যাল পোষ্ট করার ৩ ঘন্টা পর তার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গিয়েছিলো। আমি দেখতে চাই আমার ব্যপারে কি হয়। 


“JUNK RNA”

“করোনা ভাইরাসের জিনোমের ইনভেলাপ কার্যক্রম নিয়ে এযাবত যত গবেষনালব্দ সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো সম্পুর্ণই ছিলো দুর্বল এবং বৈজ্ঞানিক ভুল। বিজ্ঞান এখন জানে বাতিল আরএনএ (Junk RNA) জীবের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ ফেনোটাইপে কোন ভুমিকা রাখে না। কিন্তু বিজ্ঞান এটা জানেনা আরএনএ’তে বাতিল বলতে কিছু নেই। বাতিল আরএনএ এর লগ পর্যালোচনা এবং সঠিক বিশ্লেষন করলে বিজ্ঞান জানতে পেতো জিনোমের অভ্যন্তরের ইনভেলাপ ফেনোটাইপে যে লগ তৈরী হয় তা আসলে অপ্রয়োজনীয় কোন কিছু নয়, এটিই লক্ষ লক্ষ বছরের মনস্তাত্বিক পরিবর্তন ও অগ্রগতির সিরিয়াল প্রোটোটাইপ।”


বর্তমান পৃথিবীর প্রযুক্তি এবং গতি নিয়ে আমার মনে যে ভুল ধারনা ছিলো তাকে মিথ্যে প্রমান করে আর্টিক্যাল পোষ্ট এর ২৭ মিনিটের মাথায় আমার কাছে মেইল চলে আসলো। 


কতখন চলছি জানিনা। আনুমানিক ৪/৫ ঘন্টা হবে। এদেশের বিশেষ একটি ফোর্স আছে যার নাম RAB. তাদের পাজেরোতে করে আমাকে প্রথমে ওরা ঢাকা নিয়ে এসেছে। এখানে আমাকে গাড়ি পরিবর্তন করে অন্য একটা কালো কুচকুচে গাড়িতে তুলেছে। ভেতরে দুপাশে দুজনের মাঝে বসার পর খেয়াল করলাম গাড়িটির বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু সাথে সাথেই আমি ব্যপারটা ধরতে পারলাম না। কিছুখন পর পরিস্কার হলো ব্যপারটা। গাড়ির কাঁচ দিয়ে বাইরে দেখা যায় না। এমন কি সামনে পেছনও দেখা যায়। অর্থাৎ আমাকে অন্ধের মতো করে নেয়া হচ্ছে। তবে কোন প্রকার অসৌজন্যমুলক আচরন আমার সাথে উনারা করেন নি। হয়তো উনাদের উপর এটাই নির্দেশ। আমি সাহস করে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জবাবে উনাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত যাকে অফিসার কিংবা প্রধান বলে মনে হয় তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তরে জানিয়েছেন যে সময় হলেই নাকি আমি জানতে পারবো। তবে পথে কথা বলার কিংবা কিছু জানার কোন সুযোগ নই।

গাড়ির কালো কাচ দিয়ে বাইরের কিছুই দেখা যায়না। শুধু মাত্র তীব্র কোন আলো এসে কাচে পরলে সেটা বোঝা যায়। আমি আমার ভাবনাগুলোকে স্বাধিনতা দিলাম। আমি জানি এই মুহুর্তে আমরা কোথায় আছি। জানালায় সূর্যের আলো পড়ার উপর ভিত্তি করে আমি একটা কাল্পনিক ম্যাপ একেছি মনের ভেতরে। ঢাকা থেকে বের হয়ে গাড়িটি উত্তর-পশ্চিম দিকে চলেছে প্রায় ১ ধন্টা। এটা ঢাকা-সাভার হাইওয়ে। এরপর গাড়ির মাথা কিছুটা ডান দিকে বেকে গেছে কারণ তখন সূর্য পশ্চিমে কিছুটা ঢলে পড়েছে। এরপর গাড়ি চলেছে আরো ২ ঘন্টা। এসময়ে গাড়ির মাথা কিছুটা আকা-বাকা হলেও দিক স্থির থেকেছে উত্তর-পশ্চিম। আমার হিসেব ভুল না হলে এই মুহুর্তে আমি মির্জাপুর হয়ে টাঙ্গাইল উপজেলার উপর দিয়ে পেড়িয়ে যাচ্ছি আরো উত্তরে। সাম্মুখে ভুয়াপুর। আশেপাশে কোথাও বঙ্গবন্ধু সেতু যেখানে সিরাজগঞ্জকে ভুয়াপুরের সাথে কানেক্ট করেছে সে জায়গাটা থাকার কথা। 

হঠাৎ করেই রাস্তার ঝাকুনি কমে এলো। অর্থাৎ আমার অনুমানই সঠিক। সেতুর এরিয়াতে আছি এখন আমরা। সেতুর আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার পথ খুবই মস্ত্রীন ও উন্নত হবার কথা। 

গাড়িটা কিছুখনের জন্য কোথাও থামলো। মনে হচ্ছে গাড়িটা ঢালু কিছু দিয়ে নিচে নামছে। কিছুখন পর কিছুটা দুলে উঠলো গাড়িটা। এরপর পুরোপুরি থেমে গেলো। কিন্তু লক্ষ্য করলাম গাড়ি থেমে গেলেও গাড়িটা মৃদু কাপছে। বুঝতে পারলাম আমি এখন যমুন নদীর উপর আছি। গাড়িটি কোন ফেরি কিংবা এ জাতীয় কিছুতে উঠেছে। যেখান থেকে আমাদের গাড়ি ফেরিতে উঠলো সে এলাকাটা চেনার চেষ্টা করলাম। মনে পরে গেলো, সেতু পেরিয়েই যমুনার তীর ঘেষে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু ক্যান্টনমেন্ট। বুঝে গেলাম, এখান থেকেই তাদের নিজস্ব কোন ফেরি কিংবা নৌযানে করে গোপনে যমুনার কোন স্থানে আমাকে নেয়া হচ্ছে।


গাড়ি থামার সাথে সাথেই দড়জা খুলে গেলো। গাড়ির ভেতরের অন্ধকার থেকে হঠাৎই ঝকঝকে আলোয় আলোকিত একটি বড়সড় ঘরে আবিস্কার করলাম নিজেকে। ঘরে তেমন কিছু নেই। আরো দুটি গাড়ি আছে কোনায়। একপাশে ছোট্ট একটি রুম। তার পাশেই একটি লিফট। আমার জন্য ওখানে দুজন লোক অপেক্ষা করছিলো। টিপটপ ভদ্রলোক। আমাকে জিজ্ঞেস করলো পথে কোন অসুবিধা হয়েছে কিনা। আমার মনে হলো আন্তরিকতা নয় ওনারা দায়সারা দায়িত্ব পালন করছে। আমিও দায়সারা জবাব দিয়ে অপেক্ষায় রইলাম। 

ভদ্রলোক দুজন আমাকে নিয়ে লিফট এ প্রবেশ করলো। সুন্দর এবং আধুনিক লিফট। লিফট আমাদেরকে নিয়ে চলতে শুরু করেছে। এতখন ভাবছিলাম যমুনার পশ্চিম পাড়ে কোথায় হতে পারে এই বহুতল ভবনটি যেখানে এমন একটি অত্যাধুনিক লিফট থাকতে পারে। আমার জানামতে এমন কোন স্থাপনা এ এলাকার আশেপাশের ১০-২০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে নেই। অবাক হয়ে ভাবছি। লিফট এর বাটনগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। সাধারণত লিফট এর বাটনগুলো উপর থেকে নিচে বড় থেকে ছোট সংখ্যায় হয়ে থাকে। এখানে উল্টো। এখানে সবচাইতে উপরের সংখ্যা হলো ১। এরপর ২-৩-৪ করে ১১পর্যন্ত। বুঝে গেলাম সাথে সাথে। আমি উপরে উঠছি না, আমি নিচে নামছি। ৭ বাটনটা যখন মেরুন কালার হলো তখন আমাদের লিফট থেমে গেলো। লিফট এর দরজা খোলার পর আমার মনে হলো আমি এক লাফে বাংলাদেশ থেকে নাসার বিজ্ঞান গবেষনাগারে ঢুকে পরেছি। 



সংগে করে কিছুই আনতে দেয়নি। এমনকি কাপড়ও ওরা সংগে করে নিয়ে গিয়েছিলো। সেই কাপড় পরেই এসেছি। প্রথম দিন আমাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে এখানকার সকল নিয়ম। বাইরের জগতের সাথে সম্পুর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। অবশ্য যোগাযোগ করার কোন সুযোগও এখানে নেই। প্রাথমিক ভাবে আমাকে একটি মেডিক্যাল টিম বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে পরিক্ষা নিরীক্ষা করে কনফার্ম করেছে আমার মধ্যে কোন সমস্যা নেই। তারপরো বিশেষ প্রক্রিয়ায় আমাকে একটি নির্ধারিত রুমে অনেকটা সময় বিভিন্ন যন্ত্র লাগিয়ে রেখে দেয়। সে সময়টায় ভেতরকার বিভিন্ন ক্যামিক্যাল এর কারনে কিছুক্ষনের জন্য অচেতন হয়ে পড়ি। পরবর্তীতে বুঝতে পারি আমাকে ইচ্ছে করেই অচেতন করা হয়। যখন আমার কানের ভেতর কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করে-” আরিয়ান আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?”।

বুঝতে পারি আমার কানের ভেতর যোগাযোগের আধুনিক ডিভাইস লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এখান থেকে আমার সাথে কথা বলা কিংবা আমার কথা শুনতে পাবে।


এখানে কিভাবে কাজ হয় তা স্পষ্ট করে বোঝার উপায় নেই। কারণ প্রত্যেকেরই কাজের এরিয়া নির্ধিারিত করে দেয়া। এর বাইরে সে যেতে পারে না। যার যার কাজ সে তার নির্ধারিত ল্যাব কিংবা রুমে বসে করে। এগুলো আবার পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন হয়। এক সময় একাধিক এমনকি অধিক সংখ্যাক বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এক রুমে কিংবা ল্যাবে কাজ করে। এ সবকিছু সেন্ট্রালী কন্ট্রোল করা হয়। কে যে কনট্রলে আছে আর কে যে কর্মি তা এখানে বোঝার সহজ কোন পথ নেই। 

প্রথম প্রথম আমার ব্যুঝতে অসুবিধা হয়েছে এখানে মুলতঃ আমার কাজ কি। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বু্ঝে ফেলেছি আমাকে দিয়ে যে কাজ হবে সে কাজই আমাকে দেয়া হয়েছে। ওরা এখানে যাদের এনেছে তাদেরকে আগে থেকেই যথেষ্ট জেনেশুনে এনেছে। প্রথম কদিন আমাকে ত্রিমাত্রিক ট্রেইনারের মাধ্যমে আমার কাজের পর্যায় এবং পরিধি ও সর্বপরি কাজগুলো আমাকে কিভাবে করতে হবে সে সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান দেয়া হয়েছে। বিষয়টা যথেষ্ট একঘেয়েমির হলেও আমি মনোযোগ দিয়ে মনে গেথে নিয়েছি তাদের প্রদত্ত জ্ঞানগুলো।

ট্রেনিং শেষে আমাকে ল্যাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সেখানে আমার সাথে আরো দুজনকে পেয়েছি যাদের সহায়ক হিসেবে আমাকে কাজ করতে হয়েছে। মাঝে মাঝে তারা আমার সাথেও জেনেটিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে। আমি যদিও জানি বৈজ্ঞানিক এযাতীয় বিষয়গুলোতে আমার তেমন কোন জ্ঞান নেই তথাপিও বুঝতে পারছি আমার কাছে এমন কিছু আছে যা তাদের কাজের ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। দুজনের মধ্যে একজন ড: আরেফিন, বয়স ৬০ এর কাছাকাছি হবে, বয়সের ভাড়ে কিছুটা ন্যুজ হয়ে থাকে, অন্যজন বিশিষ্ট ক্যামিষ্ট মি: সাহাদত। ওনার বয়স ৩৫-৩৬ হবে। দুজনেই কাজের বাইরে তেমন কোন কথা বলানে না। অবশ্য এখানে কঠিন নিয়মগুলোর মধ্যে একটি হলো ব্যক্তিগত কথা না বলা। এখন পর্যন্ত আমরা একে অপরের নাম ছাড়া আর কিছুই জানতে পারিনি। 


এখানে গোপন বলতে কিছু নেই। সব কিছুই সেন্ট্রালি সার্বক্ষনিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে আশ্চার্যকর ব্যপার হলো এখানে আসার পর আমি কোন ক্যামেরা দেখিনি। তাছাড়া আমাদের ট্রেনিং এর মধ্যে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে নিয়ম ভংগের স্বাস্তি কতটা ভয়ংকর। আমাদেরকে আরো জানানো হয়েছে অনেকেই তাদের অতি উৎসাহের কারনে তাদেরকে পর্যায়ক্রমে ভয়ংকর ইউনিটে ট্রান্সফার করা হয়েছে। যেখানে টিকে থাকা খুব কঠিন।


প্রতিদিন কাজের পর নিজের রুমে চলে আসি। বিশ্রামের জন্য যথেষ্ট সময় দেয় ওরা। কিন্তু সময় কাটানোর জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই রুমে। মোবাইল কিংবা কম্পিউটার পার্সোনাল ব্যবহার করার কোন ব্যবস্থা নেই। শুধু মাত্র নিজের কল্পনায় ঘুড়ে বেড়ানোর ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কল্পনার রাজ্যে ভিড় জমায় অনেক কিছু। মা’র কথা ভাবি। ফেলে আসা আমার সময়গুলোর কথা ভাবি। আর অবচেতন মনে যে কথাটা খুব করে ভাবি সেটা হলো সামান্থা। এখানে আসার আগে যতটা আশা করেছিলাম যে, এখানে এসে হয়তো তার সাথে আমার যোগাযোগ করা সম্ভব হবে, কিন্তু তা নয়। এখানে পুরাটাই একটা গোলকধাধার মতো। গোপনিয়তা রক্ষার জন্য এরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা করেছে। সবচাইতে বড় কথা হলো সকল প্রকার ব্যক্তিগত যোগাযোগকে এখানে সম্পুর্ণ অবৈধ্য করেছে। যার ফলে গবেষনার বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কেউ কোন কথা বলেনা, এবং কেউ বলতে আগ্রহ দেখালেও কেউ শুনতে চেয়ে বিপদে পড়তে চায় না। 


আমাদের কাছে বেশিরভাগ তথ্য এবং নির্দেশনাই আসে ওয়ালে লাগানো মনিটরে। আমাদের কাজের মাঝেও দেখা যায় বিভিন্ন প্রকার অডিও কিংবা ভিডিও নির্দেশনা আসে আমাদের কাজের বিষয়ে। এতে বোঝা যায় ওনারা আমাদের প্রত্যেকের কাজ স্পষ্ট এবং নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষন ও পর্যালোচনা করছেন। মাঝে মধ্যে আমাদের কাজে কোন ভুল হলে মৃদু ভৎসনা করা হয় আবার যখন কোন কাজে সাফল্য চলে আসে তখন সেটাকে এনকারেজ করতেও দ্বিধা করেনা। 


আজ একটি মেসেজ দেয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সেন্ট্রালি একটি কমিউনিক্যাশন মডিউল ডেভলপ করার জন্য সকলকে দুদিন পর একটি নির্ধিারিত স্থানে একত্র করা হবে। সেখানে উপস্থিত হয়ে কি কি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে তার উপর একটি পুর্নাঙ্গ নোটিশ দেয়া হলো। সকলে যখন মনোযোগ দিয়ে নোটিশটা পড়ছে তখন আমি মনে মনে খুশি হচ্ছি এই ভেবে যে, এতে হয়তো সামান্থার সাথে আমার যোগাযোগ অথবা অন্তত দেখা হতে পারে। 

পরবর্তী ২টা দিন কেটে গেলো কাজের মধ্য দিয়ে। ইদানিং কাজের পরিধি বেড়ে যাচ্ছে। জেনেটিক বিহেভিয়ারের উপর আমাকে অনেক অনেক হাইপো থিসিস এর প্রোটোটাইপ বিশ্লেষন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে এ ব্যপারে আমার মধ্যেও আগ্রহও অনেক বেশি। পুর্বের জ্ঞান গুলোর মধ্যে বেশিরভাগ অংশ জুড়েই ছলো ডিএনএ (DNA), কিন্তু যেহেতু বর্তমান গবেষনার বিষয় করোনা ভাইরাস নিয়ে সেহেতু আমাকে ফোকাস করতে হচ্ছে আরএনএ (RNA) নিয়ে। যদিও দুটার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই একই ধরনের থিউরী কাজে লাগানো হয় তারপরো আমাকে নতুন ভাবে প্রথম থেকে ভাবতে হচ্ছে। বৈজ্ঞানিকরা যখন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে পুরোদস্তুর দাপাদাপি করে তখন দেখা যায় আমি চুপচাপ বসে আছি। কারণ আমার বেশির ভাগ কাজই মাথায়। জাংক লগ বিশ্লেষন করার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে, ভাইরাসটির উপরিভাগের প্রোটন কোন কোন পরিবেশে নিজেদেরকে কোন কোন ভাবে পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন করে, এর জিনোম এর মধ্যকার পলি অ্যাডেনিলেটেড লেজটি কোন অবস্থায় তার কার্যক্রম কমায় এবং বাড়ায়, এসব কিছু নিয়ে আমাকে প্রদান করা সকল তথ্য নিয়ে ভাবতে থাকি। মাথার ভেতরকার বিলিয়ন নিউরনের মাঝে আমার চিন্তাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে আমি পার করতে থাকি লম্বা সময়।



আজ প্রায় বেয়াল্লিশ দিন হলো এখানে এসেছি। যদিও এখানে দিন রাতের হিসেব রাখাটা কঠিন। শুধু চব্বিশ ঘন্টার হিসেবে চলে এখানের জীবন। সকালের সকাল কাজ শেষ করে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘন্টা আগেই তৈরী হয়ে রুমে বসে আছি। বরাবর সকাল ৫টায় ঘুম ভাংগে আমার। যদিও রুমে নাস্তা আসে ৭ টার সময়। আর ৮টায় যেতে হয় কাজে। নির্ধারিত পথে অর্থাৎ করিডোর পেরিয়ে নির্দিষ্ট লিফ্ট ব্যবহার করে কাজে পৌছতে ১০ মিনিটের সময় লাগে। আজও প্রতিদিনের মতো পৌনে আটটার সময় রুম থেকে বেরুলাম। কিন্তু আজ অন্য পথে যেতে হবে। পথ বলতে লম্বা কিছু করিডোর, কিছু লিফট পেড়িয়ে তারপর যাও। এখানে আসার পর থেকে আমি অনেক ভেবেও অনুমান করতে পারিনি আমি আসলে কোথায় আছি।

নির্ধারিত কিছু করিডোর ধরে বেশ কিছুখন এগুনোর পর একটি দরজা দিয়ে বিশাল এক হল রুমে প্রবেশ করলাম।

চোখ ধাধানো আলোয় উদ্ভাসিত চকচকে রুম। এক দিকে উচু একটা স্টেইজ, সেখানে অনেকগুলো বসার আসন পাতা রয়েছে। যদিও এই মুহুর্তে ওখানে কেউ বসে নেই। শুধু মাত্র দুজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি স্টেইজটিতে দাড়িয়ে সামনে অসংখ্য মানুষদের উদ্দেশ্য শৃংখলা বজায় রেখে আসনে বসার জন্য তাগদা দিচ্ছেন।

বিশাল রুম। প্রায় দুই হাজার মানুষ এখানে বসতে পারবে। নির্ধারিত সময়ের এখনো প্রায় ২০ মিনিট বাকি। এখনো বেশিরভাগ আসনই শুন্য। আমি সম্মুখ ভাগ দিয়ে প্রবেশ করাতে আগত মানুষগুলোর চেহারা দেখতে পাচ্ছি। খালি আসন না খুজে আমি খুজে বেড়াচ্ছি একটি পরিচিত মুখ। দু-একটা পরিচিত মুখও দেখতে পেলাম তাদের মধ্যে। ওরা আমাকে দেখে হাত উঠিয়ে নিস্পৃহ ভাবে হাই জানালো। আমি তাদের কোন রকমে প্রতিত্তর দিয়ে অন্যান্য মুখ গুলোর মধ্যে খুজতে লাগলাম। না, পেলাম না অনেক খুজেও। এখানে নেই। হয়তো এদের সাথেই নেই। আমি একেবারে নিরাশ হয়ে একেবারে পেছনের সারির বাম পাশের কোনের সিটটাতে গিয়ে বসলাম। এ লাইনের বেশির ভাগই সীটই এখন পর্যন্ত খালি। অস্থির মনটা বার বার নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছে, হয়তো এখনই সামান্থা এসে হল রুমে প্রবেশ করবে। মাথা ঘুড়িয়ে প্রতিটি দরজা প্রতিটি জায়গা তন্ন তন্ন করে খুজলাম। নির্ধারিত সময় হয়ে এলো। রুমের ধাধানো আলো কিছুটা ম্লান হয়ে স্টেজের পেছনের বিশাল আকার ডিসপ্লেটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। 

কর্তা ব্যক্তিদের আজই প্রথম একত্রে দেখতে পেলাম। দেখলেই বোঝা যায় উনারা যার যার জায়গায় যথেষ্ট যোগ্যতম ব্যক্তি। একে একে সবাই যখন কথা বলতে শুরু করলো তখনও তাদের জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া গেলো। এই প্রথম এখানে এসে তাদের সম্পর্কে অস্পষ্ট হলেও কিছুটা ধারনা পেলাম। করোনা ভাইরাসের ধ্বংসাত্মক সক্রিয়তার কারনে দুনিয়ার যে মানব বিপর্যয় নেমে এসেছে তা নিরসনে যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে তাদের সবাইকে নিয়ে তৈরী হয়েছে SOW (Save our world)।  SOW এর বাংলাদেশ ভিত্তিক গবেষনাগার হলো এটি। এখানে বিভিন্ন এলাকা এবং ক্ষেত্র থেকে নিয়ে আসা ব্রিলিয়ান্টদের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে এই মানব বিধ্বংশি করোনা ভাইরাসের এন্ট্রিভাইরাস তৈরীর জন্য গবেষনা করা হচ্ছে। তাদের মধ্য থেকে একজন উঠে ডায়াসের কাছে গেলেন। তার পেছনের বিশাল পর্দায় তিনি তাদের কার্যক্রম  সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করলেন।

- করোনা এই পৃথিবীর মানুষ জীবনের উপর  তার ভয়াল থাবা বসিয়েছে আজ প্রায় দশ বছর। আপনারা জানেন যে, এই পর্যন্ত পৃথিবী তার মানব ইতিহাসের সবচাইতে খারাপ অবস্থায় আছে। বেশ কিছু দিন হলো বাংলাদেশে গত দীর্ঘ এক দশক কাজ করে আসা RCB তাদের বিভিন্ন সীমাব্ধতা এবং লোকবলের অভাবে SOW এর সাথে একাত্ব হয়ে কাজ করছে। 

প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আলোকপাত চলতে লাগলো দীর্ঘ সময় ধরে। আমি তাদের কথা শুনছি। অবশ্য এসকল তথ্যগুলো বেশিরভাগই আমার আগে থেকেই জানা ছিলো। তারপরো মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিলাম। হঠাৎই আমার পিঠের উপর কারো আঙ্গুলের ঘষা খেয়ে মনোযোগ ছুটে গেলো। হল রুমে এখন ম্লান আলো। সে আলোয় খেয়াল করলাম হল রুমের সকল সীট এখন পরিপুর্ণ। আমার পাশের সিটটিতেও কেউ একজন বসে আছে, যদিও তার মুখ আমি দেখতে পাচ্ছিনা। কিন্তু আমি বাক রুদ্ধ হয়ে গেলাম যখন দেখলাম আমার পাশের ব্যক্তিটির হাতের আঙ্গুলই আমার পিঠে ঘষা দিচ্ছে।


স্কুলে পড়ার সময় আমরা একটা খেলা খেলতাম। তা হলো কারো শরীরের যেকোনো স্থানে আঙ্গুল ঘুড়িয়ে তার কাছে তথ্য পৌছানো। খুব সংক্ষেপ কোড এবং সিম্বল ব্যবহার করে আমরা একাজটা করতাম। আমি টের পেয়েছি একটু আগে আমার পাশে বসা ব্যক্তিটি আমাকে তার আঙ্গুলের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করেছে- “কেমন আছো আরিয়ান?, আমি সামান্থা”

আবেগকে কোন কালেই প্রশ্রয় দেইনি আমি। কিন্তু এই মুহুর্তে আমার হার্ট তুমুল ভাবে বিদ্রোহ করছে তার আবেগ প্রকাশ করার জন্য। ভালো করে তাকালাম, আবছা ভাবে সামান্থার মুখটা দেখতে পেলাম। মুহুর্ত খানেক মাত্র। পরক্ষনেই আমার পিঠে সক্রিয় হয়ে উঠলো সামান্থার আঙ্গুল। 

- সামনের দিকে তাকাও। এমন ভাবে থাকো যেনো কিছুৃই হয়নি।

বিশাল বড় কিছু পাওয়ার মতো করে আমার দুচোখ চকচক করে উঠলো। আমার বাম হাতের পাশে চেয়ারের হাতলে রাখা সামান্থার ডান হাতের পিঠে আমি আমার বামহাতটা রাখলাম। কোমল নারী স্পর্শের উপর আমার পুর্ব কোন অভিজ্ঞতা নেই। টের পেলাম ইসৎ কেপে উঠলো উভয়ের হাত দুটো। আঙ্গুল ব্যবহার করে সামান্থাকে জানালাম-

- আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?

- আমিও ভালো আছি। 

জানালো সামান্থা তার আঙ্গুল ব্যবহার করে। ওরা দুজনেই জানে তাদের কানের ভেতর সেট করা আছে শক্তিশালি ট্রান্সমিটার ও মাইক্রোফন। যে কোন কথাই কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন থাকবে না। আর ওরা এও জানে এখানে আইন অমান্যের সাস্থি কি।

- তোমার মা কেমন আছেন? (সামান্থা)

- ভালো? (আরিয়ান)

- আমার মার সাথে যোগযোগ হয়েছিলো আসার আগে? (সামান্থা)

- হয়েছে, উনি ভালো আছেন, তোমার জন্য কষ্ট পান আর চিন্তা করেন। মায়েরাতো এমনই। (আরিয়ান)

- তোমার রুম ব্লক নম্বর কত? (সামান্থা)

- 7R21, তোমারটা কোথায়? (আরিয়ান)

- আমি 9R33, তোমার থেকে ২ তলা নীচে। (সামান্থা)

- এই স্থানটা কোথায়? (আরিয়ান)

- এটা বঙ্গবন্ধু সেতুর পুর্ব পাশ পেড়িয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম তীর থেকে কিছুটা ভেতরে। এক্সেক্ট লোকেশন- 24.413805, 89.795125। (সামান্থা)

আমি অবাক হয়ে সামান্থার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। 

- কিকরে জানলে? (আরিয়ান)

প্রশ্ন করে আমিও কিছুটা বোকা হয়ে গেলাম। আমার জানা উচিত এটা সামান্থা। সামান্থা জানেবেনা এমন কিছু থাকার কথা না। 

- আরে, এটা কোন ব্যপারনা। ওদের সেটেলাইট ব্যবহার করে জেনেছি। ওরা মনে করে ওরা খুব চালাক, আসলে বালের চালাক। (সামান্থা)

সামান্থার নির্দিধায় গালি দেয়াটাকে হজম করলো আরিয়ান। কিছুখন দুজন চুপ করে রইলো। 

- কিছু কি আগানো গেলো? (আরিয়ান)

- হুম, কিছুটা, কিন্তু এদের এখানে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছিনা। তাছাড়া অনেক রিসোর্স আর সাহায্য ইলিগ্যাল পথ ছাড়া পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানেতো সেই সুযোগ নেই। (সামান্থা)

আমি তাকিয়ে রইলাম সামান্থার দিকে। সামান্থার ভাবনাগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম। এই মুহুর্তে আমার হাতটা সামান্থার হাতের উপর। আলতো করে পড়ে আছে ওর হাতের পিঠে। আমি সামান্থার ভাবনাগুলো পড়ার চেষ্টা করছি। ও সামনের দিকে তাকিয়ে বক্তার কথা শুনছে, আর একটু পরপর আমার দিকে আড় হয়ে তাকাচ্ছে। হঠাৎ করেই আমার মাথার ভেতর কিযেনো হলো। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম কেউ একজন আমাকে বলছে- “আরিয়ান, আমাকে সাহায্য করো, তোমার সাহায্য আমার খুব দরকার”।

আমি কিছুখনের জন্য স্থম্বিত হয়ে গেলাম। আমার মাথায় কে কথা বলে? আমি সামান্থার দিকে তাকালাম। সে আমার দিকে আকুতিভরা চোখে তাকিয়ে আছে? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-

- তুমি কি মনে মনে আমাকে কিছু বলছিলে? (আরিয়ান)

সামান্থা অতি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে হলো আমাকে সে নতুন করে দেখছে। সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। 

- কেনো জিজ্ঞেস করলে এই কথা? (সামান্থা)

- তুমি কি কোন বিষয়ে আমার কাছে সাহায্য চাইবার কথা ভাবছিলে?

কথাটা শোনার সাথে সাথে সামান্থা চমকে তাকালো আমার দিকে। ওর বাম হাতটা দিয়ে আমার বামহাতটা জাপটে ধরলো শক্ত করে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

- কি হয়েছে? (আরিয়ান)

- আমি যে তোমাকে কিছু বলছিলাম তা তুমি কি করে জানলে? (সামান্থা)

- আমিতো জানিনা যে, তুমি আমাকে বলেছো। শুধু আমার মাথার ভেতর কোথা থেকে যেনো কথাগুলো এলো- “আরিয়ান, আমাকে সাহায্য করো, তোমার সাহায্য আমার খুব দরকার”।


একথাটি জানার পরেই বিদুৎ পৃষ্ঠের মতো চমকে উঠলো সামান্থা। সামান্থা ঠিক একথাগুলোই মনে মনে বলেছিলো কিন্তু মনের কথাগুলো আরিয়ান হুবহু কি করে জানলো? কাকতালিয় হতে পারে ভেবে আরিয়ানের হাতটি মুঠোর মধ্যে নিয়ে আবারো আরিয়ানকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে বলে উঠলো- “আরিয়ান, তুমি শেষ পর্যন্ত আমার সাথে থাকবেতো?”

ঠিক সাথে সাথেই আরিয়ান তার মুখ দিয়েই খুব মৃদু কন্ঠে অনেকটা ফিস ফিস করে বলে উঠলো-

- থাকবো। (আরিয়ান)

বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো সামান্থা। একি দেখছে সে? আরিয়ানকে সে প্রথম থেকেই ব্রিলিয়ান্ট হিসেবেই জানতে। আর যখন দেখতে পেলো তার বাবা একজন জেনেটিক বিহেভিয়ার এর উপর এক্সপার্ট বিজ্ঞানি তখন থেকে তার এ বিশ্বাস তৈরী হয়েছে যে, আরিয়ানের মধ্যে অসম্ভব রকমের চিন্তা শক্তি এবং কল্পনা প্রবনতা কাজ করে। কিন্তু তার মাত্রাটা তার জানা ছিলো না। কিন্তু বিশ্বের সকল থিউরী উলটপালট করে আরিয়ান নতুন যে থিউরী হিসেবে নিজেকে আবির্ভূত করেছে সেটার অস্তিত্বের কথা বিশ্ববাসীর কাছে জানা নেই। এ এক অবিশ্বাস্য হাইপো সাইকোলোজিক্যাল থিউরী। এমন কিছু এর পুর্বে কখনো জানা জায়নি। আরিয়ান নিজে কি তা জানে? আরিয়ান কি কখনো তা জানবে?

আরিয়ান এবার তার ডান হাত এনে সামান্থার বাম হাতের উপর রেখে লিখলো-

- আগে জানতাম না, কিন্তু এই মুহুর্তে আমি নিশ্চিত হলাম তোমার কাছ থেকে। 

আরিয়ানের কথা শেষ হতেই হেসে উঠলো সামান্থা। আরিয়ানের হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে মনে মনে বল্লো-

- ভালো হলো, আর আমাকে কষ্ট করে তোমার সাথে সংকেত দিয়ে কথা বলতে হবে না। (সামান্থা)

- কিন্তু আমার কষ্টতো কমলো না। যাইহোক, কি ভাবছো তুমি সামান্থা। (আরিয়ান)

- তোমর অসম্ভব কল্পনা শক্তি আমাকে অতি মাত্রায় বিস্মিত করেছে। আমি বিভিন্ন সোর্স এবং যোগাযোগ মডিউলে এমন একটা প্রবাবিলিটির কথা অস্পষ্ট ভাবে জেনেছিলাম, কিন্তু এটা বাস্তব হবার পক্ষে তেমন কোন মতামত ছিলোনা। কিন্তু তুমি এমন এক বিশাল শক্তি নিয়ে বসে আছো, তা কে জানতো? (সামান্থা)

- আমার কি দোষ? (আরিয়ান)

- না, তোমার কোন দোষ নেই। তোমার এমন ক্ষমতা আছে জানার পর থেকে আমার চিন্তাগুলো অনেকটাই আশাবাদী হয়ে উঠেছে। এখানে যতটা গবেষনা করার দরকার ছিলো তা আমার ইতিমধ্যে সম্পন্য হয়েছে। আরো এগুতে হলে আমাকে আরো উন্নত মানের ল্যাব এবং যোগাযোগ মডিউল দরকার যা এখানে ওরা দিতে পারবে না। তাই ভাবছি এখান থেকে বেরুতে হবে। এরা যারা এখানে আছে তাদের সাথে আমি কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওরা কাজের বাইরে কোন কথা বলতে রাজি নয়। আমার মনে হয়েছে এখানে দায়িত্বশিল কেউ নেই। উপর থেকে অথবা বাইরে থেকে ওদেরকে কন্ট্রোল করা হয়। ওদের সার্ভারে কাজ করার সময় আমি ওদের আইপি কানেকশন হিস্ট্রি হ্যাক করে দেখেছি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাদের ল্যাব আছে। এবং একেকটি একেক মানের। আমাদের দেশের ল্যাবটি একটি পরীক্ষামুলক ল্যাব। যেহেতু রাজনৈতিক কিছু ব্যপার এর সাথে জড়িত সেহেতু এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমি গত প্রায় এক মাস লুকিয়ে তাদের সবগুলো ল্যাব এর তথ্য সংগ্রহ করেছি। যেহেতু তাদের ব্রাউজারে কিছু ফায়ারওয়্যার দেয়া আছে তাই ওদের সাথে কানেক্টেড নেই এমন কোন আইপিতে আমি প্রবেশ করতে পারিনি। কিন্তু ওদের সবগুলো ল্যাব এর মধ্যে মুল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে চীনে। অনেকে মনে করে থাকে এটি রাশিয়া কিংবা আমেরিকার মতো শক্তিশালি দেশে স্থাপন করা হতে পারে। কিন্তু করোনা আক্রান্ত বিশ্বের অনেক কিছুই এখন পরিবর্তন হয়ে গেছে। যদিও চীনকে দমিয়ে দেয়ার জন্য আমেরিকা, ভরতের মতো দেশ উঠে পড়ে লেগেছিলো কিন্তু এক পর্যায় দেখা গেলো মানব জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য বিশ্বের সকল দেশ এক সময় একত্র হয়ে কাজ করার চিন্তা করে। আর সেই সময় অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ৪ বছর আগে চীনের ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করে এর প্রধান দপ্তর চীনেই প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেহেতু এখনো অনেক জংগি সংগঠন এসব কাজের প্রোটোটাইপ চুরি করে নিজেদের আখের গোছানোর চেষ্টা করে সেহেতু প্রতিটি ল্যাবকেই অতি গোপন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে। মুল ল্যাব চীনের কাকেশাসের গোপন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সিকিউরিটির ব্যবস্থা রয়েছে। (সামান্থা)


লম্বা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো আরিয়ান। অনেকখন ধরে শক্ত করে হাত ধরে রাখায় হাতটা অসাড় হয়ে এসেছে আরিয়ানের। সামান্থা আরিয়ানের হাতটা ছেড়ে দিলো। অনুষ্ঠান চলছে। অনুষ্ঠানের শুরুর সময় দেয়া হয়েছে, কিন্তু কখন শেষ হবে তা বলা হয়নি। তাই আমরা অনুমান করতে পারছিনা আমরা আর কতখন এভাবে কথা বলতে পারবো। দুজনেই হঠাৎ কথা শেষ করার দিকে মনোযোগি হবার কথা ভাবতে লাগলাম। আবার কবে এমন সুযোগ আসে তা বলা যায় না। আমি সামান্থার হাতটায় আমার আঙ্গুল নিয়ে গেলাম-

- তাহলে আমার প্রতি তোমার নির্দেশনা কি? (আরিয়ান)

সামান্থা আবারো আরিয়ানের হাতটি মুঠোয় নিয়ে নেয়। জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানের দিকে।

- নির্দেশনা কথার মানে কি? আমি কি তোমাকে নির্দেশ দেই? (সামান্থা)

- আরে এটা কি বলো, এটাতো ঠিক যে আমরা এখন দুই জনের টিম। আর একটি টিমে অবশ্যই একজন লিডার থাকতে হয়ে। আর আমাদের দলে তুমিই লিডার হবে এটাতো বলে দেয়ার দরকার নাই। (আরিয়ান)

- এই, তুমি কিন্তু আমার উপর অত্যাচার করতেছো? আমি লিডার হবার কারন কি? (সামান্থা)

- সামান্থা, আমাদের হাতে সময় কম। তুমি মানো আর নাই মানো আমি জানি তোমার বহুবিধ যে যোগ্যতাগুলো আছে সেগুলো একজন লিডারের থাকতে হয়। তাছাড়া আমি খুব খুশি তোমার মতো লিডার পেয়ে। (আরিয়ান)

- কোন লিডার ফিডার দরকার নেই, আমরা এক সাথে কাজ করবো এটাই হলো কথা। এখন এসো কাজের কথায় আসি। এখান থেকে বের হবার কয়েকটি পথ আমি ভেবে রেখেছি। চেষ্টা করলে হয়তো আমি সফল হয়েও যেতে পারি, কিন্তু ভাবছি তোমাকে নিয়ে। কারণ তুমি আমার কাছে নেই। তোমাকে সংগে করে নিয়ে বের হবার চেষ্টা করলে আমার মনে হয় কোন ফল হবে না। যাইহোক, এব্যপারে আমি আবার প্রথম থেকে ভাববো। হয়তো কোন আইডিয়া চলে আসতে পারে। হয়তো আবারো আমাদের একসাথে হবার সুযোগ আসবে। ততদিন পর্যন্ত আমরা যার যার জায়গায় থেকে ভাবতে থাকি। কোননা কোন পথ বেরুবেই। (সামান্থা)

- আচ্ছা, করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত গবেষনা কতদুর এগুলে? (আরিয়ান)

- অনেকদুর, করোনার RNA সম্পুর্ণভাবে বিশ্লেষন করতে পেরেছি আছি। এর একটি মেডিক্যাল ডায়াগ্রামও তৈরী করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো এর একটি অতি আশ্চার্যজনক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এটি অল্প সময়েই তার বৈশিষ্ট্য বদলে নিতে পারে। কিন্তু এর চাইতে আশ্চার্যকর ব্যপার হলো যখন আমরা ল্যাবে নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাসের উপর গবেষনা চলাই এবং এদের উপর কিছু প্রতিষেধক স্থাপন করি এদের প্রোটিনের ভেতরে একটা ডিফেন্সিভ কার্যক্রম তৈরী হয় আর অল্প সময়েই সে নিজেকে প্রতিষেধকের মাত্রার সাথে এডজাষ্ট করে তার RNA রিট্রান্সক্রিপশন করে নেয়। কিন্ত আশ্চার্যকর ব্যপার হলো আমাদের ল্যাবে থাকা অন্য যে ভাইরাসগুলো রয়েছে যেগুলোর মধ্যে আমরা কোন প্রতিষেধক প্রয়োগই করিনি, দেখা যায় সেগুলোও তাদের মধ্যে সে একই প্রকার পরিবর্তনগুলো করে নেয়। সম্পুর্ণ আলাদা জায়গায় রাখা দুটি ভাইরাস কিভাবে তাদের মধ্যকার পরিবর্তনগুলো এডজাষ্ট করে নেয় সেটা একটা আশ্চার্যকর ব্যপার। এই মুহুর্তে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত আবিস্কার এ অবস্থায় গিয়ে থমকে আছে। সামনে এগুনো যাচ্ছে না।

মেরিল আইল্যান্ড, অটোয়া।

ক্রিস্টাল স্বচ্ছ গ্লাসের ভেতর দিয়ে অটোয়ার নিল জলে সন্ধের আগে থিতিয়ে পড়া সুর্যটার কিছুটা মৃয়মান আলোর প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে আছে সোফি। দৃষ্টি চলে যায় তার আরো দুরে। নদী পেড়িয়েই উচু উচু দালান ঘেরা সুন্দর ছিমছাম অটোয়া, ব্যস্ত শহর। যেখানে সোফির জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি সময় কেটেছে। 

প্রাকৃতিক সুন্দরে ঘেরা এই ছোট্ট দিপ “মেরিল আইল্যান্ড” এ “জাস্টিন হোম” নামে এই বহুতল ভবনটিতে বেশির ভাগ সময় কাটে তার। রুমের এক পাশের দেয়াল সমস্তটা জুড়েই গ্লাস দেয়া। তাই সামনের পুরোটা প্রকৃতি থাকে চোখের সামনে। সোফি ভাবনার সাগরে ডুবে থাকে….

দরজায় নক হয়েছে, বাস্তবে ফিরে আসে সোফি। মৃদু অথচ ছন্দময় নকটি সোফির অতি পরিচিত। অনুচ্চ স্বরে ভেতরে আসতে বলে আগন্তুককে। সোফি জানে প্রতিদিনের সকল রিপোর্ট দিতে এই সময় তার রুমে আসে এমিনি। মাত্র একুশ বছর বয়সের ছোট্ট মেয়েটি তার সব চাইতে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য মানুষ।

চোখ তুলে তাকায় সোফি। প্রতিদিনের মতো আজো এমিনি অফিসিয়াল ড্রেস এর উপর মাথায় জড়িয়ে রেখেছে সুন্দর একটি তুর্কি স্কার্ফ। প্রথম যখন সোফি এমিনিকে এমন পোষাকে দেখেছে তখন মনে হতো জগতের বড় বড় বুদ্ধিমান মানুষের মধ্যেও কিছু কিছু ভ্রান্তি থেকে যায় যেগুলো গোড়ামি কিংবা অন্ধ বিশ্বাস থেকে আসে। কিন্তু এই মেয়েটি তার জায়গায় ঠিকই রয়েছে কিন্তু সোফিয়ার চিন্তা পাল্টে গেছে অনেকটাই।

- আজ কেমন আছেন ম্যাডাম? (এ্যামিনি)

- ভালো, তুমি কেমন আছো? (সোফি)

- আমি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। (এ্যামিনি)

- আজকের রিপোর্ট বলো। (সোফি)

- ম্যাডাম, আমাদের ৩৮ জন স্টাফের মধ্যে সকলেই ভালো আছেন, সুস্থ্য আছেন। যে দুজন হাল্কা ফ্লু-তে আক্রান্ত হয়েছিলো তারাও সুস্থ্য হয়ে আজ সকালে কাজে যোগ দিয়েছেন। 

এডভান্স একটিভ ল্যাব জানিয়েছে তাদের নতুন যে ৩টি পরীক্ষা চলছিলো ল্যাবরেটরিতে সেগুলোর রেজাল্ট সবগুলোই নেগেটিভ এসেছে। অর্থাৎ এ প্রোজেক্টগুলোও ফেল করেছে।

আমাদের টেকনিক্যাল বাইপাস টিমে আজ সকালে নেদারল্যান্ড থেকে ‘মিলান’ যোগ দিয়েছে। আমাদের বিশেষ টিম ‘বাইপাস’ একটি সক্ষম এবং শক্তিশালি টিম। এদের সংখ্য আজ দাড়িয়েছে ১৭ জন। তাদের মধ্যে ৪ জন মাইক্রোবায়োলজির উপর এক্সপার্ট রয়েছেন যাদের মধ্যে ৩জনের ২৫টি আর্টিক্যাল ওয়ার্ড জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে। ৮ জনের যে হ্যাকিং টিম আমরা তৈরী করেছি তাদের প্রত্যেকে তাদের উপর দেয়া দায়িত্বগুলো সঠিক ভাবে পালন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। পৃথিবীর প্রতিটি আইপি ঘুরে ঘুরে ওরা আমাদের জন্য তথ্য কালেক্ট করছে। বিশেষ করে আমাদের  জাস্টিন হোম এর জন্য এক্সপার্ট খুজে বের করা, তাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্য ও ট্যাকনিক্যাল সহায়তা প্রদান করার জন্য তারা তাদের সর্বোচ্চ মেধা কাজে লাগাচ্ছে।

গত ৩ মাসে আমরা এগিয়েছি খুবই কম। করোনা ভেকসিন তৈরীতে আমাদের এগুনোর মাত্রা যদিও মাত্র ৩৪% কিন্তু ওয়ার্ড জার্নালের তথ্য অনুযায়ী SOW (save out world) সারা পৃথিবীতে ১৫৫টির ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে যৌথ ভাবে এ পর্যন্ত অর্জন করেছে ২১.৪৪%। বিশ্বের প্রতিটি ল্যাব তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যয় করছে এই প্রতিষেধক তৈরী করার জন্য।

ল্যাবরেটরি থেকে আরো জানানো হয়েছে, গত ৩ বছরে  আমরা গবেষনা করেছি  প্রায় ২৮৯টি প্রসেস। প্রতিটি প্রসেস সঠিক ভাবে কাজ করলেও দেখা যায় সে প্রসেসটির উপর ভিত্তি করে যখন আমরা কোন প্রতিষেধক তৈরী করি এবং ভাইরাসের উপর প্রয়োগ করি তখন সাথে সাথেই কিছু সংখ্যক ভাইরাস মারা পরে। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যেই কি এক রহস্যময় উপায়ে বাকী ভাইরাস তাদের RNA এর এন্ট্রিভাইরাল কোড পরিবর্তন করে সেই প্রতিষেধক এর ডিফেন্স তৈরী করে নেয়। কিন্তু আমরা যেটা  যেনে সবচাইতে আশ্চার্য হয়েছি যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ডিফেন্স ম্যাকানিজম সমগ্র পৃথিবীর সবগুলো ভাইরাসে ট্রান্সফার হয়ে যায়। এটা একটি বিশাল রহস্য। এই রহস্য উদঘাটনের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এটি এমন একটি সমস্যা যার বৈজ্ঞানিক সমাধান আছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন না। তাছাড়া এ ভাইরাসই পৃথিবীর প্রথম ভাইরাস যে কিনা নিজে নিজে তার RNA কোড পরিবর্তন করতে পারে নির্খুত ভাবে।


এপর্যায়ে এ্যামিনি তার কথা থামালো। সে চেয়ে আছ সোফির দিকে। সোফির দিকে সে অনেক আগ্রহ নিয়েই তাকায়। কারণ সোফিকে তার ভালো লাগে। ৫৫ বছর বয়স্কা এই মহিলাকে দেখলে মনে হয় সদ্য কৌশর পার করা একটি মেয়ে। আর কিছু কিছু মানুষের মানবিকতা এবং মর্যাদা এত উচ্চ হয় যে তাদের দেখলেই ভালো লাগে।


- এ্যামিনি, তোমাকে ধন্যবাদ পুরো বিষয়বস্তু ছোট্ট কিছু কথায় বিশ্লেষন করেছো। 

আমাদের গত ৩ বছরের গবেষনার অগ্রগতি যদিও মাত্র ৩৪% কিন্ত আমি মনে করি এটাও কম নয়। আমাদেরকে হতাশ হলে চলবে না। তুমি যখন “৩৪%” কথাটা বলছিলে তখন আমি খেয়াল করেছি তোমার সুন্দর চেহারায় সুক্ষ্ম একটি হতাশার ছাঁপ পরেছে। এ্যামিনি, তোমাকে ভুলে গেলে চলবে না তুমি কে। তুমি ইশরা এরদোগান এর সেই মেয়ে যে কিনা এযাবত কালের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র নায়কদের মধ্যে অন্যতম প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর মেয়ে। যোগ্য দাদার যোগ্য মায়ের সর্বোচ্চ যোগ্যতা নিয়ে তুমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছো। তুমি ১৯ বছর বয়সে তোমার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ “জিনোম বাইপাস” থিউরীর মধ্য দিয়ে প্রমান করেছো চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশুনা না করেও শুধু মাত্র প্রচেষ্টা এবং বুদ্ধি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক বড় রহস্য উৎঘাটন করা সম্ভব। তুমি তোমার ক্ষদ্র জীবনের সবটাই ব্যয় করেছো গবেষনা এবং পড়াশুনা করে নিজেকে যোগ্য হিসেবে তৈরী করায়। তুমি ইতোমধ্যে প্রমান করেছো তুমি যোগ্য। তোমার সর্বোচ্চ সহযোগিতায় আমরা “জাস্টিন হোম”কে একটি আধুনিক এবং উন্নত ফরমেটে সাজাতে পেরেছি। তোমার বুদ্ধি বিবেচনা এখন আমার এই প্রতিষ্ঠানের মুল চালিকা শক্তি। তুমি আমাকে এই স্বপ্ন দেখতে বিশ্বাস যুগিয়েছো যে আমরা একদিন সফল হবো। তোমার এই কথাটি আমি সব সময় মনে রাখি। কাজ করার অনুপ্রেরনা পাই।

এতটুকু বলে একটি স্ফিত হাসি দিয়ে এ্যামিনির দিকে ভ্রু নাড়িয়ে তাকালো সোফি।

- স্যারি ম্যাডাম। আমি ইচ্ছে করে এমনটি করিনি। আমি আমাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে খুবই আশাবাদি। সফল আমরা হবো ইনশাল্লাহ। এক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো এডভান্স কিছু ভাবতে হতে পারে। (এ্যামিনি)

- আমার মনে হয় আমরা যেভাবে এগুচ্ছি তা ঠিক আছে। যে সমস্যায় আমরা আটকে আছি সেখান থেকেই আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেখানে বিজ্ঞানের সুত্র ঠিক মতো কাজ করেনা সেখানেও কিন্তু মানুষ শেষতক পৌছে গেছে বিজ্ঞান দিয়েই। তোমার কাজ হলো “হ্যাকিং টিম” কে কাজে লাগাও পৃথিবীতে অতিপ্রাকৃতিক এবং অবৈজ্ঞানিক অথচ ক্রিয়েটিভ এমন ব্যক্তি কিংবা থিউরী যা যা আছে সেগুলো খুজে বের করে তার মধ্য থেকে কুয়েরি করে সবচাইতে বিশ্বাসযোগ্য একশটি ডাটা সংগ্রহ করো। এমন একশটি ডাটা নিয়ে আমরা সবাই একত্রে আলোচনা করলে বিশেষ কিছু ব্যক্তি কিংবা থিউরী বের হয়ে আসবে যাদেরকে আমরা কাজে লাগাতে পারবো। কি বলো?

আশ্চার্য হয়ে এ্যামিনি তাকিয়ে আছে সোফি’র দিকে। 

- কি এমন করে তাকিয়ে আছে কেনো? (সোফি)

- ম্যাডাম, আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে, আজ আপনার সাথে যে কথাটি নিজে থেকে বলবো বলে অনেক ভেবে চিন্তে এসেছি আপনি হুবহু সেই কথাটিই বলে দিলেন?

- এ্যামিনি, এর জন্যই তোমাকে আমার এতো ভালো লাগে। দুজনের দেশ, কালচার, ধর্ম, বিশ্বাস অনেকটাই আলাদা কিন্তু আমরা চিন্তা করি একইরকম করে।

- সরাসরি কারো গুন বলা যদি আমার ধর্মে অনুচিত না হতো তবে আমি প্রতিটি কথায় আপনার ভালোগুনগুলো বলতাম।

- পরে কথা হবে, আমাদের আলোচনা এখনকার মতো শেষ করতে হবে। তুমি বার বার ঘড়ির দিকে না তাকালেও আমি জানি এ সময় তোমার সন্ধ্যাকালিন ইবাদত এর সময়। আর কোন কথা আছে কি?

- ম্যাডাম, আগামী মাসের ৩ তারিখ আমাদের সবার সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয় ব্যক্তি জাস্টিন ট্রোডু স্যার এর ৪র্থ মৃত্যু বার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে আমাদের কি কি করণিয় তার উপর আগামীকাল আমরা আলোচনা করবো।

একথার সাথে সাথেই সোফি কোন কথা বলতে পারেনি। হঠাৎ করেই চুপ করে গেলো যেনো। এটি তার একটি মাত্র দুঃখের অংশ এবং বিশাল অংশ। ২৫টা বছর এক সাথে থাকার পর কোন মানুষ যখন হঠাৎ করে চলে যায় তার বিয়োগটা আসলেই খুব বড়।


---

দ্বীপের পশ্চিম দিকটা কিছুটা ওভাল আকৃতির । নদীর পাশটায় কিছুটা অংশ বাগানের মতো। তারপরই বিভিন্ন ভবন। নদীর তীর ঘেষে বাগানের অংশ নিয়ে সুন্দর পরিসরে সাজানো রাস্তা। রাস্তার দুধারে নাম নাজানা হরেক রকমের ফুল আর পাতাবাহারে আর কিছু ঘাসে ঘেড়া। এ্যামিনি প্রতিদিনের মতো আজো ভোর বেলা হাটতে বেড়িয়েছে। ফজর শেষে তার প্রিয় আল্লাহকে স্মরন করতে করতে সে বেড়িয়ে আসে তার বাসা থেকে। কিছুটা সময় নদীর পাড় ধরে হাটে। কিছুটা হাটার পরই দক্ষিন পাশে একটি ছোট্ট ঘাটলাতে বসে। আসলে এখানে ঘাটলা করা হয়েছে বসার জন্যই। সুন্দর করে সাজানো। এখান থেকে সুর্যাস্ত ও সূর্যদয় দেখা যায়। 

প্রকৃতির মনমুগ্ধকর শোভা দেখেদেখে সেই প্রকৃতির একচ্ছত্র মালিককে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে করতে আনমনে হাটছে এ্যামিলি। ভোরের হালকা কুয়াশাও এখন কমে এসেছে। চারিপাশের স্তব্দতার মাঝে পাখির কলতান তাকে বিমোহিত করে তোলে। তার অতীত, তার বর্তমানগুলো চিন্তায় নাড়া দেয়। জাষ্টিন হোম এ একাত্ব হওয়া তার একটা স্বপ্ন ছিলো। ছোট্ট থেকেই মানুষের কল্যানে কাজ করতে পারাটা এ্যামিলির কাছে ছিলো পরমপুজ্য কাজ। তাই বিভিন্ন দিকের উন্নত এবং ভালো সুযোগ থাকার পরও সোফির ডাকে সে ছুটে এসেছে। মানবতার কল্যানে বড়সর যে কাজগুলোতে সাধারণত  কেউ এগিয়ে আসেনা বিভিন্ন কারনে সেসকল উচ্চ পর্যায়ের সমস্যা সমাধানে জাষ্টিন হোম কাজ করে যায়। গত বেশ কিছু বছর ধরে করোনা ভাইরাস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জাষ্টিন হোম সোফি’র নিজস্ব চিন্তার ফল। গত দশ বছর ধরে করোনা ভাইরাস পৃথিবীকে মানব সভ্যতার উপর বিশাল এক হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। এর পেছনের কাজ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে অনেক বড় বড় ব্যক্তিরা। 

এ্যামিনি তার যোগ্যতার সবটুকু ঢেলে দিয়েছে মানবহিতকর এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে খুজে খুজে তুখোড় ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিশেষ করে যারা মানবতার কাজে ডেডিক্যাটেড তাদেরকে একত্র করেছে। সোফি আর ও একত্রে কাজ করছে দীর্ঘ দিন। এ্যামিনি যদিও এখানে একজন বেতনভোগি কর্মকর্তা কিন্তু সোফি তাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং সুযোগ সুবিধা প্রদান করেছেন। এদিক দিয়ে এ্যামিনি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করে। আর সোফি’র কাছাকাছি এসে এ্যামিনি বুঝতে পেরেছে একটা মানুষ কতটা ভালো এবং নিবেদিত হতে পারে। সোফিকে দেখার আগে এ্যামিনির কাছে একমাত্র ব্যক্তিত্ব ছিল তার শ্রদ্ধেয় নানা এরদ্যোগান।

কিছুদিন ধরে কাজের চাপ বেড়েছে। ভাইরাসের কার্যক্রম কোনভাবেই প্রতিহত করা যাচ্ছে না। গতকাল সোফি’র নেয়া সিদ্ধান্তটা এ্যামিনির মনোপুত হয়েছে। এখনকার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে এডভান্স টেকনোলজির সাথে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সমহ্নয় ঘটাতে হবে। গতকাল রাতেই এ্যামিনি এক্সপার্ট টিম নিয়ে আলোচনায় বসেছিলো। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে পৃথিবীর সকল ডাটাবেইজ এর উপর কম্পাইলিং করে একটা ডাটা স্টোর করা হবে। সে ডাটাবেইজ কে বিভিন্ন থিউরী দিয়ে কুয়েরি করে যেমনটি খুজছে তেমন বিষয়গুলো বের করে আনা হবে। সাথে সাথে  জাষ্টিন হোম এর বিশাল ক্ষমতাসম্পন্য সুপার কম্পিউটার এর সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে এর সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজ এর নতুন কোড তৈরীতে লেগে গেলো টিমের এক অংশ। অন্য অংশ সার্চ করে পাওয়া ডাটার উপর কিভাবে কুয়েরি চালাবে তার উপর ফরটিফাইভ টেরাকক্স এর এলগরিদম এর ডিজাইন করতে শুরু করলো। আর সুপার ফাষ্ট খ্যাত জোভান এর উপর দায়িত্ব পারলো যেসকল ডাটা এনক্রিপ্ট অবস্থায় পাওয়া যাবে সেগুলোকে ডিক্রিপ্ট করে নিজস্ব  সার্ভারের ব্যবহার উপযোগি করে তোলার জন্য। জোভান কম্পিউটার ব্যবহার করার চাইতে তার হাতের আশ্চার্যজনক মোবাইলটি ব্যবহার করে কাজ করতে পছন্দ করে। বাম হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অসম্ভব দ্রুত গতিতে তার মোবাইলের স্ক্রীনের উপর দৌড়তে থাকে। মোবাইলের এই ক্ষিপ্ত ব্যবহার করতে পারার কারনে সকলে জোভানের নাম দিয়েছে  “মোজো”।

হঠাৎই হাটা থামিয়ে দিলো এ্যামিনি। হাটতে হাটতে ঘাটের কাছে চলে এসেছে। ঘাটটি তার প্রিয় জায়গা হয়ে দাড়িয়েছে কবে জেনো। কাছে গিয়ে দেখলো সেখানে জোভান বসে মোবাইলে কি যেনো করছে। 

- জোভান, গুডমর্নিং।

- হাই এ্যামিনি, গুডমর্নিং।

- তুমি এতো সকালে?

- তোমার সাথে কথা বলবো তাই, অপেক্ষা করছিলাম। আমি জানি প্রতিদিন ভোরে তুমি এদিকটাতে হাটতে আসো।

- কি ব্যপারে আমাকে খুজছো তুমি? কোন সমস্যা?

- না এ্যামিনি, তেমন কোন সমন্যা নয়। আমার কিছু পরামর্শ ছিলো।

এ্যামিনি অবাক হয়ে জোভানের দিকে তাকিয়ে আছি। জোভান সাভাবিক ভাবে সান্ত কমকথা বলার মানুষ, অহেতুক কোন কথা তাকে কখনো বলতে দেখা যায়না। তাছাড়া কিছুটা আত্বকেন্দ্রীকও। তার কাজ নিয়েই সে পড়ে থাকতে পছন্দ করে। 

- মিটিংএ না বলে আলাদা বলার কোন কারণ আছো জোভান?

কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করে জোভান। মাথা ঘুড়িয়ে ব্যপারটাকে হালকা করার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষনে এ্যামিনি যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। জোভানের বিপরীত পাশের বেঞ্চটিতে বসতে বসতে এ্যামিনি বলে-

- আচ্ছা তোমার পরামর্শ বলো।

একটি কাগজ বাড়িয়ে দেয় জোভান। এ্যামিনি সেটা নিয়ে একমুহুর্ত চোখ বুলিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি দেয় জোভানের দিকে।

- আমি গতরাতে গুগুলের মুল সার্ভারের ফাস্টপ্রটোকল অর্থাৎ র’ডাটার ফায়ারওয়্যার কিছুখনের জন্য হ্যাক করে এর মধ্যে একটি বাগ বসিয়েছিলাম।

বিস্বয়ের অতিমাত্রায় এ্যামিনি বসা থেকে দাড়িয়ে গেলো। মনে হলো তার সামনে সমগ্র সুপারনোভা’র মধ্যেকার সবচাইতে আশ্চার্যকর প্রানিটা  বসে আছে।

- তুমি কি বলছো তুমি বুঝতে পারছো? তুমি বলতে চাচ্ছো এযাবত আবিস্কৃত সকল টেকনোলজির সর্বোচ্চ স্থান গুগুলের নিজস্ব র’ডাটা ফায়ারওয়্যার ভেংগে তুমি এর ভেতরে ঢুকেছো? আর তার মধ্যে বাগ বসিয়েছো? এমন হাস্যকর কথা তোমার কাছ থেকে আসা করিনি আমি।

- তোমার হাতে যে কাগজটি তাতে আছে কতটা সময় আমি র’ডাটা ব্যবহার করেছিলাম তার মধ্যে বসানো বাগ এর মাধ্যমে। অবশ্য ১৪ সেকেন্ড পরেই আমার বাগ ডিটাক্ট করে ফেলে গুগুল। কিন্তু তুমি জানো গুগুলের নিজস্ব সার্ভারে ১৪ সেকেন্ড কত বড় সময়। অবশ্য আমার প্রয়োজনীয় তথ্য  র’ডাটা থেকে কপি করে গুগুলেরই সার্ভারে রক্ষিত আমার একটি আইডিতে ট্রান্সফার করতে সময় লেগেছে মাত্র ৮৭.৩ পিকো সেকেন্ড। তোমার হাতের কাগজটিতে দেয়া আছে এই সময়ে আমি পৃথিবীর তাবদ ডাটার ৪৭% ডাটা অর্থাৎ প্রায় ৯২ট্রিলিয়ন টেরাবাইট ডাটা গুগুল র’ডাটা থেকে নিয়ে নিয়েছি। যা টের পেতে গুগুলের প্রায় ১২ সেকেন্ড সময় লেগেছে এবং প্রটেক্ট করতে সময় নিয়েছি ২ সেকেন্ড। 

মৃদু হেসে জোভান কথাগুলো বললো এ্যামিনিকে। জোভান মজা পাচ্ছে এ্যামিনির বিহ্বল অবস্থা দেখে। সচরাচর এ্যামিনিকে এমন অবস্থায় দেখা যায় না। 

হাতের কাগজটির দিকে অবিস্বাস ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে হাতের কাগজটা মিথ্যে হলে ভালো হতো। তাছাড়া জোভান যদি কাজটি করেও থাকে তবে সে জানে গুগুল এর সার্ভার থেকে এতো বিশাল পরিমান ডাটা সে ট্রান্সফার করতে পারবে না। গুগুল ঠিকই এতখনে সকল ডাটা সেফ করে নিয়েছে। সমস্যা এখানে নয়। সমস্যা হলো গুগুল মুহুর্তেই জেনে যাবে তার সর্বোচ্চ প্রটোকল ভেংগে কে বা কারা তার তথ্য চুরি করেছে। আর এটিই হবে জাষ্টিন হোম এর মৃত্যু পরোয়ানা। জোভান এতবড় বোকামি কি করে করলো ভেবে ঘামতে শুরু করলো এ্যামিনি। জোভানকে এ্যামিনি নিজে খুজে বের করে তাদের কাজে নিয়েছিলো। এসব ব্যপারে সোফি এ্যামিনির উপর সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং বিশ্বাস দিয়ে রেখেছে। এখনতো ট্রিলিয়ন ডলার জরিমান গুনতে হতে পারে এই ক্ষদে জিনিয়াস এর জন্য।

এখনো হাসছে জোভান। রাগে পিত্তি জলে যাচ্ছে এ্যামিনির। 

- তুমি হাসছো? তুমি জানো কত বড় বিপদ তৈরী করেছো? তোমার এ বিশাল ডাটা গুগুল সার্ভার থেকে বের করে আনার আগেই আমরা ধরা পরে যাবো। আর এ ধরা পরার….

হাত তুলে থামালো জোভান।

- তুমি টেনশন করোনা। শান্ত হয়ে বসো। ভেবোনা, আমি সব ঠিক করে নেবো।

- কি করে ঠিক করবে? অসম্ভবকে সম্ভব করবে তুমি?

- এ্যামিনি, তুমি উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছো। তুমি ভুলে যাচ্ছো আমি গুগুলের ফাস্টপ্রটোকল এর সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেংগে এর ভেতর থেকে  র’ডাটা বের করেছি।

- কিন্তু এটাতো গুগুলের কাছে গোপন থাকবে না। তাছাড়া এতবড় রিক্স নিয়েওতো তুমি এই ডাটা গুগুল সার্ভার থেকে বের করতে পারবে না।

- তোমার হাতের কাগজটার একেবারের নিচের লাইনে দেখো আমাদের বিশেষ গোপনিয় স্থানে রাখা অফলাইন সার্ভারে গত ১২ ঘন্টার ডাটা আপ/ডাউন তথ্য দেখাচ্ছে। সেখানে তুমি দেখতে পাচ্ছো আমাদের সার্ভারে আজ ভোর ৪:১৭ থেকে ৪:৩৯ টা পর্যন্ত ২২ মিনিটে ৯২ ট্রিলিয়ন টেরাবাইট ডাটা যোগ হয়েছে।


এবার হাত থেকে কাগজ পড়ে গেলো এ্যামিনির। তাড়াতাড়ি কাপা হাতে নিচ থেকে কাগজটি কুড়িয়ে নিলো। দ্রুত চোখ বোলালো কাগজের শেষ লাইনে। এবার নিজেকে কিছুটা অসুস্থ মনে লাগলো এ্যামিলির। সামনে বসা এই জিনিয়াসকে এখন আর জিনিয়াস মনে হচ্ছেনা, মনে হচ্ছে এটা একটা জিনিস। একটা সুপার সনিক রেডিয়েশন বোমা বসে আছে সামনে। কিছু সময়ের মধ্যেই ফেটে সে নিজে শুদ্ধো পুরো দ্বীপটাকে ধ্বংস করে দিবে সাথে জাস্টিন হোম। এ্যামিনির সামনে পুরো দুনিয়াটা দুলে উঠলো। তার সবগুলো স্বপ্ন যেনো পেজা তুলো হয়ে উড়তে লাগলো আশেপাশে। দুর্বল দৃষ্টিতে তাকালো জোভানের দিকে। অবাক হয়ে দেখলো ছেলেটা এখনো হাসছে।


- শোন এ্যামিনি। এখানে যখন কাজে এসেছি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি জীবনে যা কিছু করবো এ প্রতিষ্ঠানের জন্যই করবো। তুমি যখন আমাকে এখানে নিয়ে এলে তারো অনেক আগে থেকেই আমার পরিকল্পনা ছিলো নিজের যোগ্যতাকে ভালো কোন কাজে লাগাবো। তোমরা আমাকে সে সুযোগ দিয়েছো, তাই আমি আমার সর্বোচ্চ মেধা আর শ্রমকে কাজে লাগাচ্ছি এ জাষ্টিন হোম এর পেছনে।

- কিন্তু কি করলে তুমি? তোমার সুযোগকে তুমি এমন কাজে লাগালে যে এখন পুরো জাষ্টিন হোম ধ্বংস হয়ে যাবে?

- আমিতো আগেই বলেছি, চিন্তা করোনা। আমি কাজটি করেছি পরিকল্পনা করেই। তুমি শুনলেই বুঝবে।

- কি করে সম্ভব? এত বড় ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো হয়নি। আর ডাটার পরিমানটাওতো দেখবে? আর এ ডাটা তুমি ট্রান্সফার করেছে আমাদের সার্ভারে। এটা গোপন থাকবে কথাটা কতটা হাস্যকর?

- এ্যামিনি, তোমার কি মনে আছে গত ৪ বছর আগে পৃথিবীর কক্ষপথে একটি সেটেলাইট সার্ভারের খোজ পাওয়া যায় যা কিনা বিভিন্ন অবৈধ্য নজরদারি করছে বলে প্রমানিত হয়। 

- হ্যা, ২০২৫ সালের নভেম্বর এর ১৬ তারিখ এটিকে খুজে পাওয়া যায়। কোন দেশ এর মালিকানা স্বীকার করেনি। পরবর্তীতে বিশ্ব আইনের আওতায় এনে এটিকে বিকল করে দেয়া হয়।

- এর নাম দেয়া হয় বাই-টু-থ্রি-নাইন। সবাই জানে যে সেটেলাইটটিকে বিকল করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু গুটি কয়েকজন ছাড়া বাকীরা জানেই না যে পরবর্তীতে এটিকে শুধু সক্রিয়ই করা হয়নি বরং এটির মধ্যে বিশাল ডাটাসেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক হ্যাকার এটিকে ব্যবহার করে তাদের বিভিন্ন কাজের জন্য। গতরাতে আমি সেই সেটেলাইটকে ব্যবহার করে সমস্ত ডাটা প্রথমে এই বাই-টু-থ্রি-নাইন এর সর্ভারে ট্রান্সফার করি। তারপর আমার সাথে সংযোগ রেখে বাকি সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই আর ওখান থেকে ডাটা আমাদের সার্ভারে ডাউনলোড করি। আর এরপর যেটি করি সেটি হলো তুমি জানো প্রতিটি সেটেলাইটেই সেল্ফডেস্ট্রয়ের জন্য একটি ডায়নামাইট সেট করা থাকে কখনো যদি সেটেলাইটটি ক্ষতির কারন হয় তবে ধ্বংস করে ফেলার জন্য। আমার সব ডাটা ডাউনলোড হবার পর আমি এটিকে সেলফডেস্ট্রয়েয়িং এর মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছি। আজ ভোর ৪:৪৩ মিনিটে এটি সম্পুর্ণ ধ্বংস হয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বাইরে। এর মধ্য থেকে গুগুল মামার সাধ্য নেই কে এবং কোথায় ডাট্রা চুরি করেছে।

লম্বা কথা বলে জোভান তার হাতের মোবাইলের দিকে মনোযোগ দিলো। এ্যামিনি উঠে দাড়িয়ে ধীরে ধীরে হেটে জোভানের সামনে এসে দাড়ালো। কৃতজ্ঞতায় তার মনটা নুয়ে এলো সামনে বসা এ যাদুকর জিনিয়াসের প্রতি।


---

- এ্যামিনি।

এ্যামিনি ফিরে যাচ্ছিলো। জোভানের ডাকে থমকে দাড়ালো। পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলো।

- কি জোভান?

- দাড়াও, আমিও আসছি।

বলেই জোভান অনেকটা দৌড়ে এ্যামিলির পাশাপাশি এসে দাড়ায়। দুজন একসাথে হাটতে থাকে। 

- আরো একটা কথা এ্যামিলি।

- বলো, কি কথা।

- কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিনা। 

কিছুটা অবাক হয়ে এ্যামিলি ভ্রুকুচকে তাকায় জোভানের দিকে। একেবারে কম কথার মানুষ জোভান। তাছাড়া কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে ও। কোন কথা বলতে ইতস্থত কেনো করছে বুঝতে পারছে না এ্যামিনি।

- কি হয়েছে জোভান? তুমি আমাকে নির্ভয়ে বলো। আমরা পাশাপাশি বন্ধুর মতো কাজ করছি অনেক সময় ধরে। আমরা একে অপরকে ভালো করে চিনি। 

হাটা থামিয়ে জোভানের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বল্লো এ্যামিলি। বলেই আবার ধীর পায়ে হাটতে লাগলো। কিছুটা আস্বস্ত হলো জোভান।

- আমাদের টিমের মধ্যে যারা আছে তাদের উপর আরো একটু নজরদারী করা উচিত তোমার। আমাদের সবগুলো কাজই খুব বেশি গোপনীয় এবং কনফিডেনশিয়াল। এখানে বিস্বস্ততার ক্ষেত্রে কোন কম্প্রমাইজ করার পথ নেই। তুমি এবং সোফি ম্যাডাম মনের দিক দিয়ে অনেক উন্নত এবং তোমাদের মতোই তোমাদের চিন্তাভাবনা। জাষ্টিন হোমকে তার ডেসটিনেশনে পৌছাতে হলে তোমাদেরকে আরো বেশি সতর্ক এবং কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া উচিত। কিছু মনে করোনা, আমি তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের উপর অনধিকারচর্চা করছি।

এ্যামিনি হাটা থামিয়ে দিয়েছে। জিনিয়াস মাথায় ক্যালকুলেশন মেলাতে খুব সময় লাগে না। ও বুঝতে পারছে কোথাও কোন কন্ডোগোল আছে। কোন সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়। ও দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রতিটি ষ্টাফ নেয়া এবং তাদের উপর নজরদারী করার সব ধরনের দায়িত্ব সে নিজে করেছে। তার জানা মতে সে নির্ভেজাল এবং ভালো কিছু মানুষকে নিয়েই কাজ করছে। এ পর্যন্ত তার চোখে এর ব্যতিক্রম কোন কিছুই পড়েনি। প্রত্যেকে তাদের দায়িত্ব কর্তব্য অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কারে যাচ্ছে। 

- সরি এ্যামিনি, আমি তোমাকে মনে হয় অযথাই টেনশনে ফেলে দিলাম।

- না জোভান, তা নয়। তোমাদের প্রত্যেককে আমি খুটিয়ে খুটিয়ে পর্যালোচনা করে এবং যাচাই বাছাই করে এরপর এমন একটি গুরুত্ব পুর্ণ কাজের সাথে সংযুক্ত করেছি। আমার জানামতে তোমাদের প্রত্যেকে অত্যন্ত নিষ্ঠা এবং সততার সাথে তোমাদের দায়িত্ব পালন করছো।

- তুমি ঠিকই বলেছে এ্যামিনি। এব্যপারে তোমার সাথে আমি সহমত। কিন্তু জানোতো আমরা যারা বিভিন্ন প্রোগ্রামি এবং এ্যালগরিদম নিয়ে কাজ করি তাদের মনই থাকে সন্দেহ বাতিক। আর এ সন্দেহ বাতিকের কারনেই কিন্তু আমরা অনেক অনেক বাগ খুজে বের করতে পারি।

বলেই হাসতে থাকে জোভান। সচরাচর জোভানকে হাসতে দেখা যায় না। এ্যামিনি কিছুটা অবাক এবং অপ্রস্তুত হয়ে জোভানের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

আর তেমন কোন কথা বাড়ায়না জোভান। হাতের মোবাইলে হাত চালিয়ে ধীরে ধীরৈ হাটতে থাকে। এ্যামিনির সাথে। হাটতে হাটতে একেবারে অফিসের কাছে চলে আসে। জোভানের কাছে বিদায় নিয়ে এ্যামিনি ওর রুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু দুপা বাড়িয়েই দ্বিতীয়বারের মতো আবারো জোভানের ডাকে দাড়িয়ে পড়ে ও। হেটে তার সামনে এসে দাড়ায় জোভান। এ্যামিনির খুব কাছে দাড়িয়ে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললো-

- কপি করে আনা ৯২ ট্রিলিয়ন টেরাবাইট ডাটার কথা তুমি ২টা দিন আর সবার কাছ থেকে গোপন রাখতে পারবে? অর্থাৎ সোফি আর তুমি ছাড়া আর সবার কাছ থেকে গোপন রাখার কথা বলছি।

জোভানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো এ্যামিনি। বোঝার চেষ্টা করলো ও কি বলছে। মাথা নুইয়ে এক মুহুর্তে কি  যেনো ভেবে দেখলো এ্যামিনি।

- কেনো তুমি গোপন রাখার কথা বলছো জানিনা। কিন্তু তোমাকে আমি চিনি বলেই তোমার কথাটা আমি রাখছি। কিন্তু একটা শর্তে। আমাকে জানাতে হবে কি উদ্দেশ্যে তুমি এটি চাইছো।

একটু ভেবে নিয়ে জোভান বলল্লো-

- অবশ্যই জানাবো। তবে এখনই নয়।

- ঠিক আছে। লম্বা সময় না নিয়ে আমাকে দ্রুত জানাও। তাছাড়া সামনে এগুতে হলে এখন আমাদের মুল বিষয় কিন্তু কালেক্ট করে আনা ডাটাগুলোই, এটা ভুলে যেওনা।

বলেই এ্যামিনি তার রুমে ঢুকে গেলো।


(চলবে....)





price/webBook